রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর জীবন-পরিচয়


আমাদের মুক্তিযুদ্ধধন্য বাংলাদেশের গোটা সত্তর দশক জুড়েই ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ধ্বংস-নির্মাণ, ত্যাগ-প্রাপ্তি এবং প্রত্যাশা-আশাভঙ্গের এক অনিবার্য অস্থিরতা। দেশের এই সংকটময়তার ছায়া পড়ে প্রতিটি শান্তিকামী বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনক্রিয়ায়। উপর্যুপরি রক্তপাত আর পরাজিত শক্তির উত্থানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীসহ সচেতন মহল। এই সময়ের সাহিত্য-পরিস্থিতি সম্পর্কে সব্যসাচী লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন-

সত্তরের দশকে অসম্ভব উল্লাস আর অসম্ভব হতাশা আশ্চর্য কূটাভাসে জড়িত-মিশ্রিত হয়ে আছে। বন্দী বাংলাদেশের মুক্তি ছিলো উল্লাসের কেন্দ্রে আর হতাশার উৎস রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক আশাভঙ্গ। উল্লাসের একটি ফোয়ারা উচ্ছ্রিত হয়েছে সৃষ্টিশীলতায়- প্রধানত কবিতায়- যে-কবিতা আমাদের আবেগের মুক্তির রাজপথ। তাই এই দশকে আমাদের সব দশকের কবিরাই নবীভূত হয়েছেন আর-একবার, আর-একবার নতুন রক্তে সঞ্জীবিত হয়েছেন। কিন্তু বিশেষ করে এ-দশক সত্তরের নতুন কবিদেরই দখলে। আমি মনে করি না, তাঁরা অসাধারণ কাব্যিক সাফল্য অর্জন করেছেন। কিন্তু এই সময়ের জ্যোৎস্না-রৌদ্র, সময়ের দায়ভাগ, ভালো-মন্দ, মূল্যবোধের দ্রুত পরিবর্তনের সব ক’টি স্বরগ্রাম বাদিত হয়েছে এঁদেরই কবিতায়।১

এই এঁদের মধ্যকার উল্লেখযোগ্য একজন, ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’ বলে যিনি দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলার ব্রত কাঁধে তুলে নেন, তিনিই কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১)।

জন্ম ও বংশ-পরিচয়


রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশাল রেডক্রস হাসপাতালে। রুদ্রের সেজমামির বাপের বাড়ি ছিল বরিশাল রেডক্রস হাসপাতালের সামনে। রুদ্রের মা বরিশালে ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে অবস্থানকালে ঐ হাসপাতালে রুদ্র ভূমিষ্ঠ হন। রুদ্রের মায়ের নাম শিরিয়া বেগম, বাবার নাম শেখ ওয়ালীউল্লাহ। তাঁদের স্থায়ী নিবাস বাগেরহাট জেলার মোংলা থানার অন্তর্গত সাহেবের মেঠ গ্রামে। শেখ ওয়ালীউল্লাহর জন্ম ১৯৩৩ সালের ১৬ নভেম্বর। পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ঢাকা থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে নিজ এলাকায় ফিরে যান এবং মোংলা ডক লেবার হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আমৃত্যু তিনি ডক লেবার হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেন। রুদ্রের মা শিরিয়া বেগম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শেষ ধাপ পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। ঘরকন্নায় জড়িয়ে পড়ে আর এগোন নি। রুদ্রের বাবা ছিলেন রুদ্রের মায়ের থেকে নয় বছরের বড়। সেই হিসেবে তাঁর মায়ের জন্ম ১৯৪২ সালে।২ রুদ্রের মা মৃত্যুবরণ করেন ২০০৪ সালে।

রুদ্রের পিতামহের নাম শেখ মুহম্মদ ইউসুফ। উত্তরাধিকার-সূত্রে তিনি তাঁর পিতা শেখ মঙ্গল হাজীর বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তির মালিক হন। শেখ মঙ্গল হাজীর পিতা ধোনাই খাঁ এই ভূসম্পত্তির অধিকারী হন দখল-সূত্রে। এ-প্রসঙ্গে ‘রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ : কবি-পরিচিতি’ শীর্ষক এক রচনায় জানা যায়।

আনুমানিক উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর সময়। ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের পূর্ববঙ্গ, বর্তমান বাংলাদেশ। খুলনা জেলার তৎকালীন বাগেরহাট মহকুমার রামপাল থানার বিশাল এলাকা সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে জঙ্গল কেটে সদ্য বাসযোগ্য করে তুললেও গ্রামটিকে পুরো গ্রাম বলা যায় না। অত্যন্ত সাহসী পরিশ্রমী কিছু মানুষ সুন্দরবনের জঙ্গল কেটে জায়গাটিকে আবাদ ও বাসের যোগ্য করে তুলেছেন। এ-সময় যশোর থেকে খুলনার বাগেরহাটে পীর খান জাহান আলীর মাজারে প্রায়ই আসতেন তাঁর মুরিদ ধোনাই খাঁ। একসময় তিনি সাহেবের মেঠ-এ বসতি স্থাপন করেন, জঙ্গল কেটে জমি আবাদযোগ্য করতে শুরু করেন এবং প্রথামতো তাঁর প্রস্তুত করা আবাদযোগ্য জমির মালিক হন। ক্রমে তিনি বিশাল এলাকার অধিকারী হয়ে ভূস্বামী বলে পরিচিত হন।৩

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবার এখনো বাগেরহাট জেলার মধ্যে অত্যন্ত প্রতাপশালী ও প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। এদের আদি নিবাস যশোর জেলায়। বাগেরহাটের মোংলা অঞ্চলে এরাই প্রথম পত্তনী গড়ে। মোংলা অঞ্চলের সেই ঝোপ-জঙ্গল আর জলাভূমি এখন আগের মতো নেই। দেশের অন্যতম সমুদ্রবন্দর হিসেবে এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক দিয়ে যথেষ্ট উন্নত। বাগেরহাট জেলা-সদর থেকে মোংলা থানার দূরত্ব ৫১ কিলোমিটার। মোংলা শুধু থানাই নয়, এটি এখন পৌরসভায় উন্নীত। মোংলা থেকে ৪/৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর গ্রামের বাড়ি সাহেবের মেঠ। এটি মিঠেখালি ইউনিয়নের অন্তর্গত। সাহেবের মেঠ একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এই গ্রামে একটি উচ্চবিদ্যালয় এবং তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। রুদ্রের মৃত্যুর পরে ১৯৯২ সালে রুদ্রের পরিবার ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে মিঠেখালি গ্রামে নতুন যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়েছে তার নাম রাখা হয়েছে ‘রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ’। বর্তমানে এটি সরকারি বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।

পরিবার-পরিচিতি


সাহেবের মেঠের শেখ পরিবারের খ্যাতি রয়েছে এলাকা-জুড়ে। বিশেষত রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি রয়েছেন। শেখ খান জাহান আলীর মুরিদ হিসেবে রুদ্রের দাদুর দাদু ধোনাই খাঁ এবং তাঁর পুত্র শেখ মঙ্গল হাজী এলাকায় বিখ্যাত। তাঁর পুত্র শেখ মুহম্মদ ইউসুফকে অঢেল সম্পত্তির মালিক হিসেবে এলাকার সকলে একনামে চেনে। তাঁর পুত্র অর্থাৎ রুদ্রের পিতা শেখ ওয়ালীউল্লাহ একজন চিকিৎসক হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। শেখ ওয়ালীউল্লাহর পিতার দুই বিয়ে। তিনি প্রথম পক্ষের সন্তান। প্রথম পক্ষে তিন ভাই ও এক বোন। রুদ্রের বড়কাকার নাম শেখ নূর মুহম্মদ এবং প্রথম পক্ষের মেজকাকা (ক্রমানুসারে পঞ্চম) শেখ আবদুল জলিল। রুদ্রের বাবা ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। রুদ্রের একমাত্র ফুপুর নাম জোবেদা খাতুন। পরবর্তীকালে এই ফুপুর সঙ্গে রুদ্রের বড়মামা শেখ আবু বকর সিদ্দিকের বিয়ে হয়। সে-হিসেবে রুদ্রের ফুপুই তাঁর বড়মামি। শেষ পক্ষের তিন কাকা হচ্ছেন শেখ আহম্মদ আলী, শেখ আবুল হাসেম এবং শেখ হাবিবুর রহমান।

রুদ্রের নানা শেখ মুহম্মদ ইসমাঈল ছিলেন মোংলা এলাকার অন্যতম বিখ্যাত ব্যক্তি। তিনি একসময় গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান এবং পরবর্তীকালে গভর্নর ছিলেন। শেষদিকে মিঠেখালি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বয়সের ভারে এই দায়িত্ব পালন করতে অসুবিধা হলে তাঁর বড়ছেলে অর্থাৎ রুদ্রের বড়মামা আলহাজ্ব শেখ আবু বকর সিদ্দিক ঐ ইউনিয়নের একাধিকবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার গৌরব লাভ করেন। এলাকায় শিক্ষাবিস্তারেও তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। রামপাল ও মোংলা থানার বেশ কয়েকটি স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ব্যাপক অবদান এলাকাবাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। এই বড়মামাই রুদ্রের একমাত্র ফুপা। শেখ আবু বকর সিদ্দিক ছাড়াও রুদ্রের নানার চারটি ছেলে এবং তিনটি মেয়ে। অর্থাৎ রুদ্রের পাঁচ মামা এবং তিন খালা। দুই মামা এবং দুই খালা শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। রুদ্রের মেজমামা শেখ আবু তাহের ছিলেন নাট্যামোদী। জানা যায়, তিনি কলকাতার একটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। চলচ্চিত্রের নামটি অবশ্য জানা যায় নি।৪ এই মামার ছেলে আবু জগলুল মঞ্জু রুদ্র-প্রতিষ্ঠিত ‘অন্তর বাজাও’ সঙ্গীত সংগঠনের অন্যতম শিল্পী। রুদ্রের সেজমামা আলহাজ্ব শেখ তৈয়বুর রহমান ১৯৫৪ সালে রামপাল-দাকোপ-বটিয়াঘাটা এলাকায় যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে এমএলএ নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেজমামার ছেলে মাহমুদ হাসান (ছোটমণি) মিঠেখালি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এঁর সঙ্গে রুদ্রের বোন বীথিকা শারমিনের বিয়ে হয়। রুদ্রের ছোটমামার নাম শেখ আজিজুর রহমান। রুদ্রের মায়ের দাদার মামা বাসের শাহ্-ও ছিলেন এলাকার নামজাদা পীর। রুদ্রের বাবা ডা. শেখ ওয়ালীউল্লাহ নিজের শ্বশুরের নামানুসারে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ইসমাঈল মেমোরিয়াল হাইস্কুল’। আমৃত্যু তিনি ঐ স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

রুদ্ররা দশ ভাইবোন। রুদ্রই সকলের বড়। দ্বিতীয় বীথিকা শারমিন (শরিফুন হাসান)। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেন্সর বোর্ডে কর্মরত। তাঁর স্বামী মাহমুদ হাসান ছোটমণি ব্যবসায়ী ও মিঠেখালি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। তৃতীয় ডাক্তার মোঃ সাইফুল্লাহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে বর্তমানে ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে কর্মরত। তার স্ত্রী ডাক্তার নীলুফার ইয়াসমীন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে চিকিৎসাকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন। চতুর্থ সোফিয়া শারমিন (সাফি)। তাঁর স্বামী গাজী আহসান হাবীব একটি পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। পঞ্চম মেরী শারমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাশ করে এখন প্রবাসী। ষষ্ঠ আবীর আবদুল্লাহ স্বনামখ্যাত আলোকচিত্রী। তিনি আলোকচিত্রের জন্য বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। বর্তমানে তিনি ইউরোপিয়ান প্রেস ফটো এজেন্সির বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও আলোকচিত্র বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘পাঠশালা’র শিক্ষক। তাঁর স্ত্রী ফয়জুন্নেসা বেগম (শিল্পী)। সপ্তম সুবীর ওবায়েদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেরিন সায়েন্সে এমএসসি পাশ করে এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাঁর স্ত্রী ফওজিয়া খানম শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত। অষ্টম ইরা শারমিন (শিমু) কলকাতার শান্তিনিকেতন থেকে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে এখন মঞ্চাভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত। নবম সুমেল সারাফাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগ থেকে এমএ পাশ করেছেন। বর্তমানে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত। তাঁর স্ত্রী গাউসিয়া চৌধুরী (রুশা)। দশম হিমেল বরকত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে সেখানেই অধ্যাপনা করছেন। তিনি কবি ও গবেষক। তাঁর স্ত্রী খাদিজা পারভীন পপি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এমএ পাশ করে ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে অধ্যাপনারত।*

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর পিতৃদত্ত নাম হচ্ছে মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। ছোটবেলায় এই নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু লেখালেখি করতে এসে এই নামটি তাঁর পছন্দ হয় নি। স্কুল জীবনেই পিতৃদত্ত নামটি তিনি বদলে ফেলেন। নামের শুরুতে ‘রুদ্র’ শব্দটি যোগ করা ছাড়াও ‘মোহাম্মদ’-কে ‘মুহম্মদ’ এবং ‘শহীদুল্লাহ’কে ‘শহিদুল্লাহ’ করেছেন। কেবল লেখক-নাম হিসেবেই তিনি এই নাম গ্রহণ করেছেন, তা নয়। প্রকৃত নাম হিসেবে পরীক্ষার সনদপত্রেও এই নাম ব্যবহার করেছেন। স্কুলের ছাত্রাবস্থায় নাম নিয়ে এরকম আধুনিক চিন্তা তাঁর দূরদর্শিতার প্রমাণ বহন করে।

শিক্ষা-জীবন


রুদ্রের নিজবাড়ি সাহেবের মেঠ থেকে নানাবাড়ি মিঠেখালি খুব বেশি দূরের নয়। মিঠেখালি ইউনিয়নেই এই দুটি গ্রামের অবস্থান। ছোটবেলার অধিকাংশ সময় রুদ্র তাঁর নানাবাড়িতে কাটাতেন। নানাবাড়ির পাঠশালাতেই তাঁর হাতেখড়ি। এমনকি লেখালেখির আগ্রহও সৃষ্টি হয় ঐ নানাবাড়ি থেকে। নানাবাড়িতে ঐ সময় ঢাকার ‘বেগম’ আর কলকাতার ‘শিশুভারতী’ আসত নিয়মিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাজী নজরুল ইসলামের বইপত্র তো ছিলই। পাঠশালার পাঠ ডিঙানোর পর ১৯৬৪ সালে রুদ্র দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন নানার নামে প্রতিষ্ঠিত ‘ইসমাঈল মেমোরিয়াল স্কুল’-এ। এই স্কুলটি বাগেরহাট অঞ্চলের বিখ্যাত স্কুল হিসেবে পরিচিত। রুদ্রের বয়স তখন আট বছর। এ-সময় স্কুলের পড়ালেখার পাশাপাশি রুদ্র বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং রবীন্দ্র-নজরুলের বই পড়ার সুযোগ পান। এঁদের অনেক কবিতা শিশু রুদ্রের মুখস্থ ছিল। নানাবাড়িতে থেকে রুদ্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এরপর ১৯৬৬ সালে মোংলা থানাসদরে সেন্ট পলস স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই স্কুলে পাঁচ বছর পড়াশোনা করে তিনি ১৯৭০ সালে অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। ১৯৭১-এর মার্চ মাসে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। রুদ্রের আর নবম শ্রেণিতে পড়া হয় নি। যুদ্ধে বিজয়ের পর ১৯৭২ সালে নবম শ্রেণি টপকিয়ে রুদ্র ঢাকার ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে ভর্তি হন। থাকতেন ৫০ লালবাগে মামার বাসায়। এই স্কুলে থেকেই তিনি ১৯৭৩ সালে ৪টি বিষয়ে লেটার মার্কসসহ বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। পিতামাতার প্রবল ইচ্ছে সত্ত্বেও রুদ্র বিজ্ঞান শাখায় পড়ে ডাক্তার হওয়ার পথে যান নি। তিনি নিজের পছন্দে মানবিক শাখায় চলে যান। ঢাকা কলেজে এসে রুদ্র পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। এ-সময়ে তিনি সহপাঠী হিসেবে পান কামাল চৌধুরী, আলী রীয়াজ, জাফর ওয়াজেদ, ইসহাক খানসহ একঝাঁক তরুণ সাহিত্যকর্মীকে। কামাল চৌধুরী কবি ও প্রশাসক, আলী রীয়াজ প্রাবন্ধিক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ইসহাক খান কথাসাহিত্যিক এবং জাফর ওয়াজেদ কবিতাচর্চা থেকে আপাত-বিদায় নিলেও সাংবাদিকতায় নিবেদিত, দৈনিক মুক্তকণ্ঠের চিফ রিপোর্টার ছিলেন। ঢাকা কলেজ থেকেই রুদ্র ১৯৭৫ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন দ্বিতীয় বিভাগে। দুবছরে রুদ্র ক্লাস করেছিলেন মাত্র ১৮টি। নির্বাচনী পরীক্ষা দিতেও সমস্যা হয়েছিল। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিএ (অনার্স) শ্রেণিতে। বন্ধু জাফর ওয়াজেদও একই বিভাগে একসঙ্গে ভর্তি হন। এ-সময় আরো যাঁরা তাঁর লেখক-বন্ধু ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম রেজা সেলিম, ইসহাক খান, মঈনুল আহসান সাবের, সুব্রত শংকর ধর, সলিমুল্লাহ খান, তুষার দাশ, বিশ্বজিৎ ঘোষ, রফিকউল্লাহ খান, ভীষ্মদেব চৌধুরী, আলমগীর রেজা চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ অধিকারী, সাজেদুল আউয়াল, মোহন রায়হান, রতন মাহমুদ, শাহজাদী আঞ্জুমান আরা মুক্তি প্রমুখ। এ-সময় রুদ্র থাকতেন ২১ সিদ্ধেশ্বরীতে, বন্ধু বদরুল হুদা সেলিমের বাসায়।

১৯৭৮ সালে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মনোনয়নে সাহিত্য-সম্পাদক পদে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কামাল চৌধুরী (ছাত্রলীগ) এবং আলী রীয়াজ (বাসদ-ছাত্রলীগ)। বন্ধু জাফর ওয়াজেদও ডাকসু-তে সদস্য পদে প্রার্থী হন এবং জয়লাভ করেন। আর সেবার সাহিত্য-সম্পাদক নির্বাচিত হন আলী রীয়াজ। রুদ্র সরাসরি ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বে না-এলেও নির্বাচনে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে প্রকাশ করেন। তাঁর এই বিশ্বাস জীবনের শেষদিন পর্যন্ত টিকে ছিল।

রুদ্র আবাসিক ছাত্র ছিলেন সলিমুল্লাহ হলের। কিন্তু যতদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকতেন তার অধিকাংশ সময় কাটাতেন ফজলুল হক হলের কামাল চৌধুরীর ৩০৯ নম্বর কক্ষে অথবা রেজা সেলিমের ১১০ নম্বর কক্ষে। ১৯৭৯ সালে রুদ্রের অনার্স পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্লাসে উপস্থিতির হার কম থাকায় অনেক অনুরোধও বাংলা বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডক্টর আহমদ শরীফ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে এবং জাফর ওয়াজেদকে পরীক্ষা দিতে অনুমতি দেন নি।৫ পরের বছর ১৯৮০ সালে এঁরা পরীক্ষা দেন এবং বিএ (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়ে। এ-সময় রেজা সেলিমও তাঁদের সঙ্গে পরীক্ষা দেন।৬ এরপর নানা রাজনৈতিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় রুদ্রের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা আবারো পিছিয়ে পড়ে। অবশেষে ১৯৮৩ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবনেই রুদ্রের ২টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রথম গ্রন্থের প্রকাশক ছিলেন বুক সোসাইটির পক্ষে বিশিষ্ট সাহিত্যিক আহমদ ছফা। বইটির প্রকাশের সময়-সম্পর্কে রুদ্রের বন্ধু রেজা সেলিম জানিয়েছেন-

রুদ্রের প্রথম কবিতার বই ‘উপদ্রুত উপকূল’ বেরোয় ফেব্রুয়ারি ঊনআশি সালে। আমার খুব মনে আছে, সে সময়টায় ওর অস্থিরতাগুলোর কথা। ইতিমধ্যে আমাদের সব ব্যবধান ঘুচে আমরা হয়ে উঠেছিলাম সময়ের খুব কাছাকাছি। একই সাথে বেরিয়েছিল মোহনের ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’ এবং রীয়াজের আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রবন্ধের বই ‘বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ’। এই বই তিনটি এবং সেই সময়টি আমাদের সবচে’ উজ্জ্বল এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।৭


ছাত্রাবস্থায় রুদ্রের দ্বিতীয় যে-বইটি প্রকাশিত হয়। তার নাম ‘ফিরে চাই স্বর্নগ্রাম’। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮১ সালে। এই দুটি গ্রন্থের জন্যে ছাত্রাবস্থায়ই তিনি ‘সংস্কৃতি সংসদ’ প্রবর্তিত ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ লাভ করেন যথাক্রমে ১৯৮০ ও ১৯৮১ সালে।৮ এরকম কৃতিত্বের মধ্যে দিয়েই অতিবাহিত হয়েছে রুদ্রের শিক্ষাজীবন। তাঁর কলেজ-জীবন কাটে ৫০ লালবাগের মামাবাড়িতে। আর বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে কোনো হলেই স্থায়ীভাবে ছিলেন না। কিছুদিন থেকেছেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার সঙ্গে ১১/১ উত্তর বাসাবো ভাড়া-বাড়িতে। ওখান থেকে এসে ওঠেন বন্ধু বদরুল হুদা সেলিমের ২১ সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িতে। এ-সময় বন্ধু আলী রীয়াজের বাড়ি ২৩ সিদ্ধেশ্বরীতেও কিছুদিন থেকেছেন।

সংসার-জীবন


রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ২৯ জানুয়ারি ১৯৮১ সালে বিয়ে-বন্ধনে আবদ্ধ হন। এ-বিয়েতে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। স্ত্রীর নাম তসলিমা নাসরিন। লেখালেখির কারণে তিনি আলোচিত ও জনপ্রিয় হন। একপর্যায়ে বিতর্কিত হয়ে পড়েন। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠলে দেশ ছেড়ে তিনি আত্মনির্বাসিত। তসলিমা নাসরিন ‘নির্বাচিত কলাম’ গ্রন্থের জন্যে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ হচ্ছে শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা, অতলে অন্তরীণ, লজ্জা, শোধ, আমার মেয়েবেলা, নির্বাসিত নারীর কবিতা প্রভৃতি। ‘লজ্জা’ উপন্যাসটি সরকার নিষিদ্ধ করেছে। তসলিমার মূল পেশা ছিল চিকিৎসা। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার হিসাবে কাজ করতেন। তাঁর পিতা ডাক্তার রজব আলী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সার্জন।

রুদ্র ও তসলিমার পরিচয় লেখালেখির সূত্র থেকে। পরিচয় রূপ নেয় প্রেমে। এ-সময় তাঁদের সঙ্গী ছিলেন কবি আলমগীর রেজা চৌধুরী। কবি হিসেবে রুদ্র তখন মোটামুটি পরিচিত। নাসরিনও মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস-কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চায় অগ্রণী, ছাত্রছাত্রী সংসদের নির্বাচিত সদস্য (সাহিত্য বিভাগ)। সম্পাদনা করতেন ‘সেঁজুতি’ নামের অনিয়মিত সাহিত্যপত্র। তাঁদের প্রণয় ও পরিণয় সম্পর্কে রুদ্রের কবি-বন্ধু আলমগীর রেজা চৌধুরী লিখেছেন,

আমার প্রিয় মফস্বল শহর ময়মনসিংহের বাসায় দু’গলি পর রুদ্রের প্রেমিকা, পরবর্তীকালে স্ত্রী, তসলিমা নাসরিনের বাসা। তসলিমার বড়ভাই রেজাউল করিম কামাল আমার পরিচিতজন। সেই সূত্রে নাসরিনের সাথে পরিচয়। নাসরিন কবিতা ভালোবাসতো। মেডিকেলশাস্ত্র পড়তো, কাব্যপ্রেম হিসেবে ‘সেঁজুতি’ নামে একটি অনিয়মিত কবিতাপত্র বের করতো। নাসরিন প্রথম রুদ্র-সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়। আমি তার কেমন বন্ধু ইত্যাদি ইত্যাদি।

ঠিকানা দিয়েছিলাম রুদ্রকে লেখার জন্যে। এভাবে নাসরিনের যোগাযোগ। রুদ্রের সঙ্গে নাসরিনের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে আমার বোনের বাসায় ২৮ কালীশংকর গুহ রোডে। তার দুবছর পর ওরা বিয়ে করে প্রচলিত প্রথা ভেঙে একা-একা। সাক্ষী শুধু কবি নির্মলেন্দু গুণ, নাট্যশিল্পী শাহদাত হোসেন হীলু, কবি মাসুদ বিবাগী আর আমি। তারও অনেকদিন পরে ওরা ঘর-ঘর খেলা শুরু করলো রাজারবাগের এক বাসায়। নাসরিন ডাক্তারি পাস করে রুদ্রের ঘরে। আমি জীবিকার কারণে টাঙ্গাইলে। তারপরও ওদের দুজনের সঙ্গে অনেক দিনরাত্রির স্মৃতি আছে, যা মধুর। ওদের বিবাহ উৎসব বড্ড চমৎকার বেজিং চিনে রেস্তোরাঁয়। এ-দেশের অধিকাংশ কবি-সাহিত্যিক উপস্থিত ছিলেন। আসলে রুদ্র জীবনের জন্যে বর্ণাঢ্যতা পছন্দ করতো।৯


রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বিয়ে করেছিলেন অভিভাবকের অমতে। তাঁর পিতার সঙ্গে মানসিক দূরত্ব ছিল। এ-অবস্থায় সামাজিক প্রথার বাইরে গিয়ে বিয়ে করায় তাঁর পিতা হয়তো কষ্ট পেয়েছিলেন। তবে ভাইবোনেরা এ-বিয়ে মেনে নিয়েছিল সানন্দে। রুদ্র তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তসলিমাও পাস করে বেরোন নি। তসলিমার পরিবারও এ-বিয়ে মেনে নিতে পারে নি। ডাক্তারি পাস করার পরে তসলিমা তাঁর পরিবারের বন্ধন ছিঁড়ে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। তাঁরা মোহাম্মদপুরে বাসা নিয়ে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। বিয়ের প্রায় আড়াই বছর পরে রুদ্র স্ত্রীকে নিয়ে বাগেরহাটে গ্রামের বাড়িতে যান। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রুদ্রের বাবা তাঁদেরকে গ্রহণ করেন। ঢাকায় ফিরে রুদ্র তাঁর বাবাকে একটি চিঠি লেখেন। এই চিঠিতে পিতা-পুত্রের আদর্শিক দূরত্বের কথা প্রকাশিত হয়েছে। পিতামাতার মতের বাইরে গিয়ে রুদ্রের এভাবে বিয়ে করার যৌক্তিক ব্যাখ্যাটাও চিঠিতে প্রকাশিত হয়েছে।

১৮.৬.৮৩
মুহম্মদপুর

আব্বা,


পথে কোনো অসুবিধে হয় নি। নাসরিনকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গত পরশু ঢাকা ফিরেছি। আপনাদের মতামত এবং কোনোরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আমি বিয়ে কোরে বউ নিয়ে বাড়ি যাওয়াতে আপনারা কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু আমিতো আমার জীবন এইভাবেই ভেবেছি। আপনার সাথে আমার যে ভুল বোঝাবুঝিগুলো তা কখনোই চ্যালেঞ্জ বা পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব নয়। স্পষ্টতই তা দুটি বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। ব্যক্তি আপনাকে আমি কখনোই ভুল বুঝিনি। আমি জানি না, আমাকে আপনারা কিভাবে বোঝেন।

এ তো চরম সত্য কথা যে, একটি জেনারেশনের সাথে তার পরবর্তী জেনারেশনের অমিল এবং দ্বন্দ্ব থাকবেই। যেমন আপনার আব্বার সাথে ছিলো আপনার। আপনার সাথে আমার এবং পরবর্তীতে আমার সাথে আমার সন্তানের। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাত কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব নয়। আমরা শুধু এই সংঘাতকে যুক্তিসংগত কোরতে পারি। অথবা পারি কিছুটা মসৃন কোরতে। সংঘাত রোধ কোরতে পারি না। পারলে ভালো হতো কিনা জানি না তবে মানুষের জীবনের বিকাশ থেমে যেতো পৃথিবীতে।

আমার মনে পড়ে না, আমার এ ছাব্বিশ বছরেÑ একদিনও আপনি পিতা হিসাবে আপনার সন্তানকে আদোর কোরে কাছে নেন নি। আশেপাশের অন্য বাবাদের তাদের সন্তানদের জন্যে আদোর দেখে নিজেকে ভাগ্যহীন মনে হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কখনো কষ্ট প্রকাশ করিনি।

ছোটবেলায় আমার খেলতে ভালো লাগতো, খেললে আমি ভালো খেলোয়াড় হতাম। আপনি খেলতে দিতেন না। ভাবতাম, না খেল্লেই বোধহয় খুব ভালো, ভালো মানুষেরা বোধহয় খেলে না। আবার প্রশ্ন জাগত, তাহলে আমার খেলতে ভালো লাগে কেন? আমি কি তবে খারাপ মানুষ! আজ বুঝি, খেলা না-খেলার মধ্যে মানুষের ভালোমন্দ নিহিত নয়Ñ কষ্ট লাগে!

আমিও স্বপ্ন দেখতাম আমি ডাক্তার হবো। আপনার চেয়ে বড় ডাক্তার হয়ে আপনাকে ও নিজেকে গৌরব দেবো। সন্তান বড় হলে পিতারই তো সুখ। আমি সেভাবে তৈরিও হচ্ছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কি যে এক বিরাট পরিবর্তন এলো। একটি দেশ, একটি নোতুন দেশের জন্ম হলো। নোতুন চিন্তার সব কথা হতে লাগলো। নোতুন স্বপ্ন এলো মানুষের মনে। সবাই অন্যরকম ভাবতে শুরু করলো। আমিও আর আমার আগের স্বপ্নকে ধরে রাখতে পারিনি। তারচে’ বেগবান এক স্বপ্ন আমাকে টেনে নিলো। আমি সিরিয়াসলি লিখতে শুরু করলাম। আগেও একটু-আধটু লিখতাম, এবার পুরোপুরি।

আমি আমার আগের সব চিন্তা-ভাবনার প্রভাব ঝেড়ে ফেলতে লাগলাম নিজের চিন্তা থেকে, জীবন থেকে, বিশ্বাস, আদর্শ থেকে। অনেক কিছুর সঙ্গে সংঘর্ষ লাগতে লাগলো। অনেক কিছুর সাথে ভুল বোঝাবুঝি শুরু হলো। কখনো ক্ষোভে আমি অপ্রত্যাশিত কিছু কোরে ফেলতে লাগলাম। আবার আমার বিশ্বাসের সাথে মিল এমন অনেক মানুষের দেখা পেলাম। তাদের সাথেও সংঘাত হলো। একি, সবার সাথেই সংঘর্ষ হয় কেন, মনে মনে আমি অস্থির হয়ে পড়লাম। তাহলে কি এ-পথ ভুলপথ। আমি কি ভুলপথে চলেছি। কখনো মনে হয়েছে আমিই ঠিক, এই-ই প্রকৃত পথ। মানুষ যদি নিজেকে ভালোবাসতে পারে তবেই সে সবচে’ সুন্দর হবে। নিজেকে ভালোবাসতে গেলেই সে তার পরিবারকে ভালোবাসবে। আর পরিবারকে ভালোবাসলেই সে একটি গ্রামকে ভালোবাসবে, এক গোষ্ঠীর মানুষকে ভালোবাসবে। আর একটা গ্রাম মানেই তো সারা পৃথিবী। পৃথিবীর সব মানুষ সুন্দর হয়ে বাঁচবে।

আমি আমার বিশ্বাসে স্থির হয়েছি। আমি আমার নিজের কথা সব ক্ষেত্রে বুঝিয়ে বলবো, যতভাবে সম্ভব। না বুঝতে চাইলে বোঝাবো কিন্তু বুঝে না-বোঝার ভান করলে তাকে চিহ্নিত করে দেয়া এবং পরমুহূর্ত থেকেই তার সাথে সংঘাতে যাওয়া। কারন সত্য তো একটা। একটাই সত্য। পৃথিবীতে কতো বড় বড় কাজ করছে মানুষÑ একটা ছোট পরিবারকে সুন্দর করা যাবে না! অবশ্যই যাবে। একটু যৌক্তিক হলে, একটু খোলামেলা হলে কতো সমস্যা এমনিতেই মিটে যাবে। সম্পর্ক সহজ হলে, কাজও সহজ হয়। আমরা চাইলেই তা করতে পারি। জানি না এই চিঠিখানা আপনি ভুল বুঝবেন কিনা। ঈদের আগে আগে বাড়ি আসবো। আম্মাকে বলবেন যেন বড়মামার কাছ থেকে হাজার চারেক টাকা নিয়ে আমাকে পাঠায়। বাসায় রান্নার কিছুই কেনা হয়নি। বাইরে খাওয়ার খরচ বেশি। এবং অস্বাস্থ্যকর। আম্মার তদারকিতে দেয়া সম্পত্তির এতটুকুই তো মাত্র রিটার্ন। আপনার সেন্টিমেন্ট থাকা স্বাভাবিক, কারন আপনার শ্বশুরবাড়ি। আমাদের কিসের সেন্টিমেন্ট। শিমু মোংলায় পড়বে। বাবু ইশকুলে। আপনারা না চাইলেও এসব করা হবে। দোয়া করবেন।

শহিদুল্লাহ


রুদ্র ও তসলিমার দাম্পত্য জীবন বেশ ভালোই কাটছিলো। রুদ্রের উৎসাহ, প্রেরণা ও সহযোগিতায় তসলিমাও লেখালেখির জগতে পুরোমাত্রায় জড়িয়ে পড়েন। কবি হিসেবে তসলিমার পরিচিতি ও জনপ্রিয়তাও হয়েছিল বেশ। আর এই কবি-খ্যাতির পেছনে রুদ্রের যথেষ্ট অবদানকে তসলিমাও অস্বীকার করেন নি---

রুদ্রকে আমি আমার সতেরো বছর বয়স থেকে চিনি। সেই সতেরো বছর বয়স থেকে রুদ্র আমার সমস্ত চেতনা জুড়ে ছিল। আমাকে যে-মানুষ অল্প অল্প করে জীবন চিনিয়েছে, জগৎ চিনিয়েছেÑ সে রুদ্র। আমাকে যে-মানুষ একটি একটি অক্ষর জড়ো করে কবিতা শিখিয়েছেÑ সে রুদ্র।১১

কিন্তু রুদ্র-তসলিমার সংসারযাপন স্থায়ী হয় নি। ছয় বছরের দাম্পত্য জীবন শেষে তাঁরা আলাদা হয়ে যান। ১৯৮৭ সালে উভয়ের সম্মতিতেই তালাক হয়। তালাক হওয়ার পরে রুদ্রের বিরুদ্ধে তসলিমা নানারকম অভিযোগ করেছেন। একপর্যায়ে গোটা পুরুষজাতির বিরুদ্ধেই তাঁর কলম সক্রিয় হয়ে ওঠে। সে-সময়ে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ‘পূর্বাভাস’ পত্রিকায় একটি চিঠি লেখেনÑ

আর্ত আবেদন


আশির দশকের তরুণ লিখিয়েদের মধ্যে তসলিমা নাসরিন ইতিমধ্যে তরুণ কবি হিসেবে নিজেকে স্বতন্ত্রভাবেই উপস্থাপিত করতে পেরেছেন। অগভীর ছুঁয়ে যাওয়া হলেও তাঁর ভাষা মেদহীন এবং বেশ জোরালো। মোটেই মেয়েলি গন্ধ নেই। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর কলামবন্দি রচনাগুলোর ভেতর পুরুষ-বিকারগ্রস্ততা লক্ষ্য করছি। লেখাগুলো ঝগড়াটে মেজাজের। অগ্রজ লেখক হিসেবে আমার, তাঁর সম্ভাবনার প্রতি একধরনের দুর্বলতা রয়েছে। আমরা সবাই জানি তাঁর দাম্পত্য জীবন সংঘাতময়। তার জন্যে প্রথমত দায়ী রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে আমি মোটামুটি সকল পুরুষদের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রচ- ধিক্কার জানাচ্ছি। আশা করছি, এরপর আপনার ক্ষুরধার লেখনি থেকে পুরুষেরা রেহাই পাবে। আপনি বরং সৃজনশীল লেখার ব্যাপারে সিরিয়াস হন।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ঢাকা।১২

পত্রিকায় প্রকাশিত চিঠিতে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেন নি কিংবা তসলিমা নাসরিনের উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের জবাবও দেন নি। বিয়ে-বিচ্ছেদ রুদ্রকে কষ্ট দিয়েছে। নানাভাবে সে-কথা তিনি বলেছেন। এমনকি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে চিঠিও লিখেছেন। তাঁদের এই বিয়ে-বিচ্ছেদ নিয়ে বাজারে নানা মতবাদ চালু থাকলেও রুদ্র এক সাক্ষাৎকারে নিজের মতামত ব্যাখ্যা করেছেন। সাপ্তাহিক ‘পূর্ণিমা’ একবার ‘বিয়ে-বিচ্ছেদ’ বিষয়ে একটি প্রচ্ছদকাহিনী প্রকাশ করে। সেখানে রুদ্রের সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক একটি প্রতিবেদনে সাংবাদিক শিহাব মাহমুদ লিখেছেন-

সাত-আট বছর আগের কথা। তরুন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তখন লিখছেন বেশ। এরকম লেখালেখির সূত্রে একবার ময়মনসিংহ যেতে হয় তাঁকে কবিতা পড়বার জন্যে। ময়মনসিংহ সেই সময় খুবই পরিচিত ছিলেন একটি মেয়ে তসলিমা নাসরিন। বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি তখন লিখতেন চিঠি। চিঠিগুলো থাকতো চমকে ভরা, সাহসী কখনো-সখনো। রুদ্রর সঙ্গে পরিচয় হলো তসলিমার। পরিচয় থেকে দুজনের প্রেম। বছর দেড়েক ধরে এই প্রেম চলে, যোগাযোগ থাকতো চিঠিতে। মাঝে-মধ্যে এঁদের দুজনকে একই সঙ্গে দেখা যেত। হয়তো ঢাকায় তসলিমা এসেছেন, কিংবা রুদ্র চলে গেছেন ময়মনসিংহে। দুজনের এই চুটিয়ে প্রেম করবার দর্শক ছিলেন ঢাকার অসংখ্য লেখক, কবি এবং ময়মনসিংহের তরুণ লেখকরা। দেড় বছর এরকম চলার পর রুদ্র-তসলিমার বিয়ে হয় কোর্টশিপের মাধ্যমে। এরপর দুজনের আড়াই বছর অপেক্ষা, তারপর দাম্পত্য জীবনের শুরু। পাঁচ বছরের এই দাম্পত্য জীবনও একসময় শেষ হয়ে গেল বিয়ে-বিচ্ছেদের মাধ্যমে। কিন্তু কেন ভাঙলো এই বিয়ে? রুদ্রর নিজের মুখেই শুনুন সেই কথা : ‘যদি এককথায় বলতে হয়, তাহলে বলবো অ্যাডজাস্টমেন্ট না হওয়া। বিয়ের আগে পরস্পরকে কাছ থেকে জানা বা বোঝার অবকাশ আমাদের একেবারেই ছিলো অল্প। কারণ মেয়েটি থাকতো ময়মনসিংহে এবং আমি ঢাকায়। দুমাস-তিনমাস পরপর আমাদের দেখা হতো। চিঠিই ছিল আমাদের যাবতীয় আশ্রয়। যখন একসাথে থাকা শুরু হলো, তখনি আমি দেখলাম আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তার বিস্তর ব্যবধান। জীবন এবং বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আমার অবস্থান হলো অ্যান্টি-এশটাবলিশমেন্ট। উড়নচ-ি স্বভাব আমার মজ্জাগত। তাছাড়া জীবনাচরণের ক্ষেত্রে আমি যাবতীয় সংস্কার এবং প্রচলিত নিয়ম-নীতির বিরুদ্ধ শিবিরবাসী।’ রুদ্র এবং তসলিমার মধ্যে এই নিয়ে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। তবে রুদ্র তাঁর জীবনাচরণ ও বিশ্বাসের কোনো কিছুই তসলিমার কাছে গোপন করেন নি। কিন্তু তসলিমা কি এসব জানতেন না? জানতেন না কি যে রুদ্র তথাকথিত সংসারের শিকলে জড়িয়ে পড়বার নয়?

অথচ রুদ্র ভেবেছিলেন তসলিমার মানসিকতাও তারই মতো। তাঁর নিজের কথা : ‘মেয়েটির মধ্যে প্রচলিত নিয়ম-নীতির প্রতি অবজ্ঞা আমি দেখতে পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সে আমারই মতো মানস-গঠনের। কিন্তু বাস্তবের ক্ষেত্রে এসে দেখলাম তার ভেতরে এক গোঁড়া, সংকীর্ণ রমণীর বসবাস। এবং সে তার মতো করেই আমাকে গড়ে নিতে চায়। তো সংঘাত অনিবার্য।’ আর এই সংঘাতের পরিণাম হিসেবেই রুদ্র ও তসলিমার বিয়ে-বিচ্ছেদ ঘটে যায়। বিয়ে ভেঙে গেলে, রুদ্রের পরিচিতজনরা কেউই সেই ভাঙনকে সহজে মেনে নিতে পারে নি। অধিকাংশই দোষারোপ করেছিলো রুদ্রকেই। আসলে সাধারণ মানুষ বিচ্ছেদের কারণ কখনো খতিয়ে দেখার সুযোগ পায় না বলেই এমন হয়, বললেন রুদ্র। বিচ্ছিন্ন হবার পর একধরনের অভ্যস্ততার কারণে রুদ্রর খুব এলোমেলো লেগেছিল। কষ্টও পেয়েছেন। কিন্তু এখন তাঁর তেমন খারাপ লাগে না। রুদ্র বললেন, ‘সম্প্রতি মেয়েটির সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। একজন পরিচিতার মতোই মনে হয়েছে তাকে। এর বেশি কিছু নয়।’

বিচ্ছেদ ঘটে গেলেও রুদ্র মেয়েদের ঢালাওভাবে দোষারোপ করতে চান না, যদিও জীবন সম্পর্কে মেয়েদের ধারণা খুবই সংকীর্ণ বলে তাঁর মনে হয়েছে। আসলে রুদ্র চেয়েছিলেন প্রচলিত দাম্পত্য সম্পর্কের পরিবর্তে একধরনের মুক্ত দাম্পত্য সম্পর্ক পালন করতে। কিন্তু তসলিমা শেষপর্যন্ত তা মেনে নিয়ে টিকে থাকতে পারে নি বলে জানালেন রুদ্র। তবে এই দাম্পত্য জীবন টিকিয়ে রাখার জন্য দুজনেই চেষ্টা করেছিলেন। একটা সন্তান থাকলে সেই সন্তানের কারণে সংসার টিকতে পারে এই ধারণায় একসময় সন্তান চেয়েছিলেন ওঁরা। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষা পূরণ হয় নি। রুদ্র বললেন, ‘জানি না কার ত্রুটি! কারণ ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয় নি।’ রুদ্র এখন বিয়ের আগের মতোই যাপন করছেন একধরনের মুক্তজীবন। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিয়ে করেছেন না কেন? উত্তরে রুদ্র বললেন : ‘এখনো এমন কোনো মেয়ের সাথে পরিচয় হয় নি, যার সাথে একত্রে থাকতে পারি।’১৩


বিয়ে-বিচ্ছেদ সত্ত্বেও শেষদিকে দুজনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক আবার প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। রুদ্র সম্পর্কে তসলিমার ভুল ধারণা কিছুটা কমে এলে তাঁরা বিভিন্ন আড্ডায়-আসরে ঘনিষ্ঠ হন। বিশেষত কবি অসীম সাহার ‘ইত্যাদি’-র আড্ডায় তাঁদের দেখা যেত। রুদ্র যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, তসলিমা তখন তাঁকে দেখতেও গিয়েছিলেন। তসলিমা এ-সম্পর্কে লিখেছেন-

অসীমদার কাছে রুদ্রের অসুখের খবর পেয়ে আমি হলিফ্যামিলির দুশ’ একত্রিশ নম্বর কেবিনে রুদ্রকে দেখতে গিয়েছি। অসুখ তেমন কিছু নয়, শতকরা তিরিশজন যে-অসুখে ভোগে, পাকস্থলিতে না-খাওয়ার ক্ষত। রুদ্রের খুব নিকটে বসে আমি বলেছি, রুদ্রের চুল কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে আমি বলেছিÑ ভেবো না, তুমি শিগরি সেরে উঠবে। শুনে রুদ্র বলেছেÑ ‘কী জানি, এই যাত্রাই শেষ যাত্রা কিনা।’ আমি হেসেছিলাম।১৪


তসলিমার ভুল যখন ভেঙেছে, রুদ্র তখন আর নেই। রুদ্র সম্পর্কে তসলিমার যতই ক্ষোভ-নিন্দা-অপবাদ থাক, মৃত্যুর পরে লেখা ‘রুদ্র ফিরে আসুক’ শীর্ষক লেখা থেকে তসলিমার কলমেই রুদ্রকে চিনে নেয়া যেতে পারে। আমি এক অমল তরুণী, রুদ্রের উদোম উদগ্র জীবনে এসে স্তম্ভিত দাঁড়িয়েছিলাম। যে কবিকে আমি নিখাদ ভালোবাসি, যে প্রাণবান যুবককে ভালোবেসে আমি সমাজ-সংসার তুচ্ছ করেছি, হৃদয়ের দুকূল ছাওয়া স্বপ্ন নিয়ে যাকে প্রথম স্পর্শ করেছিÑ তাকে আমি অনিয়ন্ত্রিত জীবন থেকে শেষ অব্দি ফেরাতে পারি নি। তার প্রতি ভালোবাসা যেমন ছিল আমার, প্রচ- ক্ষোভও ছিল তাই। আর রুদ্র সেই মানুষ, সেই প্রখর প্রশস্ত মানুষ, যে একই সঙ্গে আমার আবেগ এবং উষ্মা আর ভালোবাসা এবং ঘৃণা ধারণ করবার ক্ষমতা রেখেছে। রুদ্রকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, দূর থেকেও। রুদ্র সেই মানুষ, রুদ্রই সেই মানুষ, যে-কোনো দূরত্ব থেকে তাকে ভালোবাসা যায়।

যৌথজীবন আমরা যাপন করতে পারি নি। কিন্তু যত দূরেই থাকি, আমরা পরস্পরের কল্যাণকামী ছিলাম। রুদ্রের সামান্য স্খলন আমি একদিন মেনে নিই নি, রুদ্রের দুচারটে অন্যায়ের সঙ্গে আমি আপোস করি নি- পরে সময়ের স্রোতে ভেসে আরো জীবন ছেনে, জীবন ঘেঁটে আমি দেখেছি, রুদ্র অনেকের চেয়ে অনেক বড় ছিল, বড় ছিল হৃদয়ে, বিশ্বাসে। রুদ্রের ঔদার্য, রুদ্রের প্রাণময়তা, রুদ্রের অকৃত্রিমতার সামনে যে কারুকে দাঁড় করানো যায় না।১৫

কর্মময় জীবনের কথা


রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কোনো প্রতিষ্ঠানের চাকরি করা দূর থাক চাকরির জন্যে দরখাস্তই করেন নি। সাহিত্য, বিশেষত কবিতাই ছিল তাঁর একমাত্র কর্ম।

রুদ্রের পরিবার ছিল অবস্থাপন্ন। ছাত্রজীবন বিলম্বিত হলেও বাড়ি থেকে টাকা আসত। অতিরিক্ত প্রয়োজনে মায়ের কাছে চিঠি লিখে টাকা আনতেন। এছাড়া তাঁর অন্য উৎসও ছিল। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সার্বক্ষণিক বন্ধু জাফর ওয়াজেদ জানিয়েছেন,

রুদ্রের কয়েকটি রিকসা ছিল। ওগুলো ভাড়ায় খাটতো। ভালো আয় ছিল তাতে। পকেট ভর্তি টাকা থাকতো তাঁর। আমাদেরÑ মানে বন্ধুদের বেশ খাওয়াতো।১৬

তাঁর আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কবি আলমগীর রেজা চৌধুরী স্মৃতিচারণমূলক একটি রচনায় লিখেছেন-

চিংড়ি-ব্যবসা করে অনেক টাকা কামাতো। রিকসার মালিক থেকে কামাতো। রিকসার মালিক থেকে ঠিকাদার। বহুবিধ ব্যবসা ছিল ওর। পকেটভর্তি সব সময় টাকা থাকতো, খরচ করতে ভালোবাসতো।১৭


অবশ্য এই রিকসার মালিকানার বিষয়টি সম্পর্কে রুদ্রের ভাই ডা. মোঃ সাইফুল্লাহ কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন। ১৯৮৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পরীক্ষার পরে রুদ্র ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর নিকট সম্পর্কীয় হেমায়েত ভাইয়ের সঙ্গে ঠিকাদারি ব্যবসায় ভালো রোজগার হতো। কিন্তু এ পেশায় তাঁর মন বসে না। তাই ঠিকাদারি ছেড়ে আবার ঢাকায় চলে আসেন। বলা যায়, কবিতার টানেই তিনি ফিরে আসেন।

১৯৮৬ সালের দিকে রুদ্র আবার মোংলায় যান। এবার নতুন উদ্যোগÑ চিংড়ির খামার। নিজেদের জমি এবং পার্শ্ববর্তী অনেক জমি লিজ নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘সোনালি খামার।’ এসময় দুটি চিংড়িঘের রুদ্র পরিচালনা করতেন। প্রথম দিকে বেশ আয়ের মুখ দেখা গেল। কিন্তু মন যাঁর কবিতার, তাঁর পক্ষে কি ব্যবসা মানায়! বছর তিনেক যেতে-না-যেতেই রুদ্রের চিংড়ি-ব্যবসায় লোকসান হতে থাকল। রুদ্র আবার ঢাকায় ফিরে এলেন।

রুদ্রের মনের অস্থিরতাই তাঁকে কোনো জীবিকার পথে স্থায়ী হতে দেয় নি। কবিতার প্রতি সার্বক্ষণিক দায়বদ্ধতার কারণেই রুদ্র আর কোনো কাজের প্রতি মনোযোগী হতে পারেন নি। কারো কাছে হাত-পাতার স্বভাবও তাঁর ছিল না। পারিবারিক সম্পদ থেকেই রুদ্র তাঁর জীবন নির্বাহ করতেন। এই পেশাহীনের পেশা-সম্পর্কে রুদ্রের ঘনিষ্ঠ অগ্রজ কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেছেন-

... অথচ পূর্ণকালীন লেখক ছিল সে। ‘পূর্ণকালীন’Ñ কেননা লেখা ছাড়া আর-কোনো পেশায় ওকে নিয়োজিত থাকতে দেখি নি। শুনেছি মোংলায় সে চিংড়ির চাষ করেছিল, শুনেছি মৃত্যুপূর্বের দিনগুলোতে সে ঢাকায় একটি চাকরির সন্ধানে ব্যাপৃত ছিল। কিন্তু শেষাবধি কোনো-কিছুই করা হয় নি তারÑ কবিতা ছাড়া, লেখা ছাড়া। রুদ্রের কবি-জীবনের জন্য এই বাহ্যিক পেশাহীনতা প্রকারান্তরে সুফলই বয়ে এনেছিল। এই বয়সের একজন লেখকের কাছে পরিমাণগতভাবে যেটুকু আমাদের স্বাভাবিক প্রত্যাশা, রুদ্র তার চেয়ে বেশিই দিয়েছে। স্বভাবগতভাবে অতিপ্রজ এই কবির কাছে থেকে এই প্রাপ্তি, আমাদের সাহিত্যের জন্য কম-বড় সুসংবাদ নয়!১৮


সাহিত্য-জীবন


রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সাহিত্য-জীবন শুরু হয় স্কুলের ছাত্র থাকার সময়েই। রুদ্র শুধু কবি তথা সাহিত্যিক ছিলেন না। সাহিত্য-জীবনের পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েছে তাঁর সংস্কৃতি-জীবন। রুদ্র যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়েন, তখন তাঁর বয়স আট বছর। সে-সময় ইসমাঈল মেমোরিয়াল হাইস্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কবিতা আবৃত্তি করে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু তাঁর বাবা ছিলেন ঐ স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিষদের সভাপতি। তাই বাবা নিজের পুত্রকে প্রথম পুরস্কারটি না-দিয়ে অন্যকে দিলেন। এই বঞ্চনা শিশু-রুদ্রের মনে দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। অবশ্য বাবা তাঁকে পুরস্কার বাবদ অনেক বই কিনে দেন। কিন্তু শিশু-রুদ্র তা প্রত্যাখ্যান করেন।

বছর দুয়েক পরে রুদ্র ভর্তি হন মোংলার সেন্ট পলস হাইস্কুলে। সেখানে প্রতিটি আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় রুদ্র প্রথম স্থান অধিকার করেন। রুদ্রের বয়স যখন এগারোয় পড়েছে, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে পাঠ্যবইয়ের সমস্ত কবিতাই রুদ্রের মুখস্থ হয়ে যায়। সে-সময় বুদ্ধদেব বসুর কবিতার অনুকরণে একটি কবিতা রচনা করেন। সেই ১৯৬৬ সালে রুদ্রের কবিতা রচনার হাতেখড়ি। কবিতাটি অবশ্য আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। এরপর রুদ্র নিয়মিত কবিতা লিখতেন। কবিতার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলা এবং নাটক করার দিকেও রুদ্র ঝুঁকেছিলেন সেই কিশোর বয়সেই। কিন্তু খেলাধুলার প্রতি বাবার নিষেধাজ্ঞার কারণে রুদ্র আর খেলার দিকে মন দেন নি।

১৯৬৮ সালে রুদ্র তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন, তখন মামাতো ভাইদের সঙ্গে নিয়ে নানির ট্রাংক থেকে কিছু টাকা চুরি করেন। সকলে বলেছিল সে-টাকা দিয়ে সিনেমা দেখতে যাবে। কিন্তু রুদ্রের সিদ্ধান্তে সেই টাকায় বেশকিছু বই কিনে একটি লাইব্রেরি গঠন করা হয়। এর নাম দেয়া হয় ‘বনফুল লাইব্রেরি’। ১৯৭০ সালে রুদ্র যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন, তখন মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে নিয়ে অর্থাৎ বনফুল লাইব্রেরির সদস্যদের নিয়ে একটি নাটক মঞ্চায়ন করেন। নাটকের নাম ‘কালো টাইয়ের ফাঁস’। এ-নাটকে রুদ্র ছাড়াও অভিনয় করেন মোঃ সাইফুল্লাহ, সাব্বির হাসান রুমি, মাহমুদ হাসান ছোটমনি, আছিয়া খাতুন ও আবু জগলুল মঞ্জু। ইতোমধ্যে রুদ্র নিজের লেখা কবিতায় একটি পুরো খাতা ভরে ফেলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়ির অনেক কিছুর সঙ্গে সেই খাতাটিও পুড়ে যায়।

রুদ্রের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকায়। রুদ্র তখন ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলে দশম শ্রেণির ছাত্র। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কবিতাটিতে কবির নাম ছাপা হয় নি। কবিতার নাম ছিল ‘আমি ঈশ্বর আমি শয়তান’। প্রথম লেখায় স্বাভাবিকভাবেই অপরিপক্বতার ছাপ রয়েছে। কিন্তু তাঁর জীবনদর্শনের ছায়াপাত ঘটেছে প্রথম কবিতায়ই। রুদ্র এটিকে তাঁর কোনো বইয়ে স্থান না-দিলেও প্রথম প্রকাশিত রচনা হিসেবে এর মূল্য রয়েছে-


আমি ঈশ্বর আমি শয়তান


আমায় যদি তুমি বলো ঈশ্বর,
আমি বলব, হ্যাঁ আমি তাই।
আমায় যদি বলো পাপী শয়তান,
আমি বলব, হ্যাঁ আমি তাই-ই।

-কারণ আমার মাঝে যাদের অস্তিত্ব
তার একজন ঈশ্বর; অপরজন শয়তান।
তাই যখন শয়তানের ছবিটি ভাসে
আমার মানব অবয়বে- তখন আমি পাপী।
আর যখন সত্যের পূর্নতায় আমি-
মানবের কল্যানে আমার কর্ম
ঠিক তখনই আমি ঈশ্বর; কারন
সত্য, পুন্য আর মানবতাই ঈশ্বর।



এরপর রুদ্রের ‘দুর্বিনীত’ নামের একটি কবিতা প্রকাশিত হয় ‘দুর্বিনীত’ নামের একটি সংকলনে। ১৯৭৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এ-সংকলনে কবির নাম ছাপা হয় ‘মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’। এর পর থেকে কবি তাঁর নামের আগে ‘রুদ্র’ শব্দটি যোগ করেন। স্কুলের মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনেও এ-নামটি ব্যবহৃত হয়। এ-নাম সম্পর্কে কবি কামাল চৌধুরী জানিয়েছেন-

এই নামে পরিচিত হতে সে ভালবাসত। আমরা মাঝেমধ্যে মজা করে শহিদুল্লাহ বলে ডাকলে সে মনঃক্ষুণœ হতো। বস্তুত তখন থেকেই এই নামটি তার জীবনযাপনের সাথে যথার্থই খাপ খেয়ে গিয়েছিল। এই নাম নিয়েও তাকে কম সংগ্রাম করতে হয় নি। কাব্যভুবনেও অনেকের অপছন্দ ছিল এই ‘রুদ্র’-সংযোগ। দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিক পত্রিকার বেশ ক’জন সাহিত্য-সম্পাদক এই নামের জন্য প্রথমদিকে তার কবিতা ছাপেন নি। তারা নামটি বদলাতে বলেছিলেন। রুদ্র রাজি হয় নি। অবশ্য পরে রুদ্র নাম বহাল রেখেই সবাই তার কবিতা ছেপেছিলেন। কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেই রুদ্রের দুতিনটি কবিতা দৈনিক আজাদে ছাপা হয়েছিল।১৯


১৯৭৩ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে রুদ্র পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় নিবেদিত হয়ে পড়েন। প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় গুরুত্বের সঙ্গে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই রুদ্র তাঁর সময়ের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান।

১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সম্পাদনা করেন ‘অনামিকার অন্য চোখ এবং চুয়াত্তোরের প্রসব যন্ত্রনা’ নামের একটি প্রতিবাদী সাহিত্য-সংকলন। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘অশ্লীল জ্যোৎস্নায়’ নামের আরেকটি সাহিত্য-সংকলন। এ-সংকলনের মাধ্যমে রুদ্রের ‘উপলিকা’ নামের ‘না-গল্প, না-কবিতা’ আঙ্গিকের নতুন সাহিত্যের প্রস্তাবনার এবং চর্চার সূত্রপাত। ‘উপলিকার’ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রুদ্রের অভিমত ‘সাময়িকপত্র সম্পাদনা’ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে একটি ‘উপলিকা’ উদাহরণ হিসেবে তুলে দেয়া হল।

একটি মারাত্মক স্বপ্নভুক দিন


খুব ভোরেই উঠেছি আজ। জানালায়
সকাল উঁকি দিচ্ছে। আকাশে মেঘ নেই-
ঘরময় গতরাতের ক্রমাগত পোড়া
সিগারেটের টুকরো। টেবিলে অসংযত বই।

সেভ কোরে ঘরখানা ঝেড়ে নিয়ে
ইস্ত্রিকরা পাঞ্জাবিটা পোরেছি।
যথেষ্ট কাজ আছে আজ। মনে মনে
এক রকোম সাজাই। প্রথমে স্মৃতি
গত সাতদিন দ্যখা হয় নি, হয়তো
ভাবছে খুব অথবা নিশ্চয়ই অভিমান
বা ও রকোম কিছু একটা কোরেই আছে।

অতঃপর পত্রিকা অফিসগুলোতেও
যাওয়া দরকার। বিজ্ঞাপনের কয়েকটা বিল
এ্যাখোনো হয় নি, তা ছাড়া নোতুন
একটি কবিতার বই প্রকাশিত হোয়েছে
কিনতে হবে। এ ছাড়াও হাসানের সাথে
একবার দেখা না কোরলেই নয়।

কয়েকখানা পোস্টকার্ডও কিনতে হবে। বহুদিন চিঠি লিখি নাÑ
এ রকোম ভাবতে ভাবতে ঘর থেকে বেরোলেই
কে য্যানো বোল্লো : ‘আজ হরতাল’-


‘উপলিকা’ ছিল রুদ্রের এক ধরনের সাহিত্য-নিরীক্ষা। কবিতার এক নতুন রীতি হিসেবে এই উপলিকা-র প্রচলন করেন। তাঁর এই প্রয়াস পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠা না-পেলেও সেই সময়ে বেশ আলোচিত হয়েছিল।

১৯৭৬ সালে রুদ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। থাকতেন বন্ধু বদরুল হুদা সেলিমের বাসা ২১ সিদ্ধেশ্বরীতে। পাশেই তরুণ প্রাবন্ধিক আলী রীয়াজের বাসা। এই দুই বাসায় তখন পালাক্রমে আড্ডা বসত সাহিত্যের। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, বদরুল হুদা সেলিম এবং আলী রীয়াজ ছাড়াও যোগ দিতেন কামাল চৌধুরী, রেজা সেলিম, জাফর ওয়াজেদ, ইসহাক খান প্রমুখ। এ-সময় তাঁরা ‘বিক্ষোভ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এঁরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আড্ডা দিতেন গফুর মিয়ার ক্যান্টিনে। ঐ আড্ডায় টেবিল চাপড়ে নিজেদের লেখা ও সুর করা গান গাইতেন আওলাদ হোসেন, সাজেদুল আওয়াল প্রমুখ। তাঁরা একটি গানের দল গঠন করে নাম রাখেন ‘গাভীদের রাখালেরা’। পরে এদের সঙ্গে যুক্ত হন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আলী রীয়াজ, কামাল চৌধুরী, জাফর ওয়াজেদ প্রমুখ। রুদ্র এই সংগঠনের নতুন নাম ঠিক করেন ‘রাখাল’। ১৯৭৮ সালে গঠিত এই ‘রাখাল’ -গোষ্ঠী তখন বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাহিত্য সংগঠনের মধ্যে অন্যতম আলোচিত দল। এর সদস্য ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন ছিল ‘সিম্ফনী’ নামে। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন রেজা সেলিম, তুষার দাশ, আমিরুল ইসলাম টিপু, গোলাম রব্বানী, মুজাহিদ শরীফ, আহমদ আজিজ, ফারুক মঈনউদ্দীন, লালন ফরহাদ প্রমুখ। আমিরুল ইসলাম টিপুর সম্পাদনায় তখন ‘সিম্ফনী’ নামের একটি সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশ পেত। এক সময় ‘সিম্ফনী’-গোষ্ঠী ‘রাখাল’-গোষ্ঠীর কর্মকা-েও সমবেত হয়। ‘রাখালে’র কর্মকা- সম্পর্কে রেজা সেলিম জানিয়েছেন-

আমার আজ গভীরভাবে মনে পড়ছে সেই দিনগুলোর কথা, যখন রুদ্রের নেতৃত্বে আমাদের বৈঠক হতো। আমরা বেশিরভাগে সময় বসতাম মধুর কেন্টিন-সংলগ্ন গোলাকার ঘরে, রুদ্রই যার নাম দিয়েছিল ‘নাচঘর’। আমরা আলাপ করতাম কবিতা নিয়ে, কবিতাকে জীবন-ঘনিষ্ঠ করে গড়ে তোলবার প্রক্রিয়া নিয়ে সত্তরের মধ্যভাগে যেসব তরুণ কবি প্রগতি ও সাহসের চেতনাকে ধারণ করে গড়ে উঠছিলেন, আমরা তাঁদের প্রায় সবাইকে সেখানে পেয়েছিলাম, একদিন এক বিকেলের সভায় সেখানেই পরিচয় হয়েছিল মোহন রায়হানের সাথে।

ঠিক হলো, ‘রাখাল’ আয়োজিত কবিতার আসর হবে। আমাদের বন্ধুদের নিশ্চয়ই মনে আছে সেই তীব্র ও তীক্ষè অমর বাণীটির কথা ‘কবিতা ও রাজনীতি একই জীবনের দুইরকম উৎসারণ’Ñ রাখালের পটভূমিতে এই বাক্যটির জন্ম হয়েছিল। ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৮ সকাল দশটায় রাখাল আয়োজিত যে-কবিতাপাঠের আসর বসেছিল কলাভবনের সামনে, আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, তার সকল ঐতিহাসিক সম্মান ও কৃতিত্ব রুদ্রের।

সন্জীদা খাতুনের গান দিয়ে শুরু করা সে-অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী এস এম সুলতান, আর অনুষ্ঠানের মর্যাদাকে কালোত্তীর্ণ করে তোলার জন্য আনা হয়েছিল সুলতানের অমর চিত্রকর্ম ‘চরদখল’। বিশাল ক্যানভাসের এই ছবিটি আমাদের আবহমানের জীবনকে কবিতার সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল।

রুদ্রের জীবন ও আকাক্সক্ষার অতিঘনিষ্ঠ চেতনার ফসল ‘রাখাল’ খুব বেশিদিন অব্যাহত থাকে নি। কিন্তু আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, রাখালের কয়েকমাসের কর্মকা- আর একটি অনুষ্ঠান, আমরা যারা সদ্য সাহিত্য-পিপাসু ছিলাম, আমাদের সতর্ক করেছে। আমরা যে কোনোক্রমেই তথাকথিত নান্দনিক বোধের চর্চায় ডুবে সাহিত্যে মানুষের জীবনকে অঘনিষ্ঠ করে না-রাখিÑ রাখাল আমাদের সে-শিক্ষা দিয়েছিল। লিখবার জন্য দেখবার অনেক কিছু আছে, কবিতা শুধু রাতের প্রেরণা নয়, দিনের প্রকাশ্য আলোয় আমার দেশকে ভালোবাসার মাধ্যম, সে অনুপ্রেরণা আমাদের দিয়েছে রাখাল আর রুদ্র।২০


এ-সময় রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আলী রীয়াজ, জাফর ওয়াজেদ, শাহজাদী আঞ্জুমান আরা, কামাল চৌধুরী এবং বদরুল হুদা সেলিম মিলে ‘নক্ষত্রবীথি’ নামে একটি কবিতাপত্র প্রকাশ করেন। কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়ে পত্রিকাটি বন্ধ হয় যায়। এর কোনো কপি উদ্ধার করা যায় নি।

১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রছাত্রী সংসদের নির্বাচনে রুদ্র বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মনোনয়নে সাহিত্য-সম্পাদক পদপ্রার্থী। একই পদের জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হন আলী রীয়াজ এবং কামাল চৌধুরী। বিজয়ী হন আলী রীয়াজ। তবু তিনবন্ধুর সম্পর্ক অটুট ছিল। এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও যেন তাঁদের সাহিত্যচর্চারই অংশ।

১৯৭৯ সালে রুদ্রের কবিতার প্রথম বই ‘উপদ্রুত উপকূল’ প্রকাশিত হয় বুক সোসাইটি থেকে। এ-বইটি সম্পর্কে কামাল চৌধুরী লিখেছেন-

প্রকাশক ছিলেন কবি আহমদ ছফা। প্রথম গ্রন্থে রুদ্র সচেতন পাঠকের দৃষ্টি কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। এই গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতাটি। এটি সে ‘সমকাল’ পত্রিকার জন্য অনুরুদ্ধ হয়ে লিখেছিল। এই কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তিÑ ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’ কিংবা ‘ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা’Ñ প্রবল আলোড়ন তুলেছিল পাঠকসমাজে। প্রথম গ্রন্থেই রুদ্র নিজেকে আখ্যায়িত করেছিল ‘শব্দ-শ্রমিক’ হিসাবে। বলেছিল ‘আমি কবি নইÑ শব্দ-শ্রমিক/ শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাই ভুল বোধে ভুল চেতনায়।’২১


এ-বইটির জন্যে রুদ্র ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ প্রবর্তিত ‘মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন।

১৯৮০ সালে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার অনুপ্রেরণায় গঠিত হয় ‘দ্রাবিড়’ নামের একটি প্রকাশনা-সংস্থা। রুদ্র দ্রাবিড়ের সক্রিয় কর্মী হয়ে পড়েন। এ-সময় কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার বাসায় রুদ্র থাকতেন। ১৯৮১ সালে ‘দ্রাবিড়’ থেকে প্রকাশিত হয় রুদ্রের কবিতার দ্বিতীয় বই ‘ফিরে চাই স্বর্নগ্রাম’। এই বইটির জন্যেও রুদ্র মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার দ্বিতীয়বার লাভ করেন। এ-সময় মুহম্মদ নূরুল হুদার তত্ত্বাবধানে এবং রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর তৎপরতায় ‘দ্রাবিড়’ থেকে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কামাল চৌধুরীর ‘মিছিলের সমান বয়সী’ (কবিতা), ইসহাক খানের ‘নগ্ন নাটমন্দির’ (ছোটগল্প), খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রাসোমন’ (অনুবাদ), বশীর আল-হেলালের ‘ক্ষুধার দেশের রাজা’ (ছোটগল্প) প্রভৃতি ছিল ‘দ্রাবিড়ে’র উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা।

রুদ্রের দ্বিতীয় গ্রন্থ বেশ আলোচিত ও জনপ্রিয় হয়। এ-গ্রন্থের প্রথম সমালোচনা প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘সন্ধানী’তে। সমালোচক হাসান ফেরদৌস লেখেন-

তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ফিরে চাই স্বর্নগ্রামে’ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ চোখ ফিরিয়েছেন বিশাল বাংলার দিকে, যার প্রতিটি পরদায় ইতিহাস হয়ে মিশে আছে তার অস্তিত্ব ও ঠিকানা। যে অস্থির ও প্রলোভিত সময়ে রুদ্রের বাস, তার দিকে অনায়াস সাহসে তিনি তাকাতে পারেন। ‘উপদ্রুত-উপকূলে’ই (কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ) সে-সংবাদ আমরা জেনেছিলাম। অস্তিত্বের ঠিকুজি এষণায় ব্যস্ত তাঁর পরিশ্রমী চোখ এই নতুন কাব্যগ্রন্থে আরো তীর্যক হয়ে উঠেছে, আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে সময়ের নাড়ির সাথে। সম্ভবত এই ঘনিষ্ঠ সহবাসের প্রেরণাতেই তাঁর কণ্ঠস্বরও হয়েছে আলোকমুখী- ‘বনভূমি, বৃক্ষময় হাত তবে প্রসারিত করো/মেঘের জরায়ু ছিঁড়ে নামুক জলের শিশু/জন্মের চিৎকারে ভরে দিক অজন্মা ভুবন।’ অপহৃত স্বর্ণগ্রাম, যার মড়া খুঁটির দাগ এখনো মাটিতে লেগে, বাউলী ব্যাকুল জিজ্ঞাসায় তাকেই অন্বেষণ করে ফেরেন তিনি।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর স্বভাবগত আড়ম্বরহীনতা তাঁর কবিতাতেও নিরাভরণ উচ্ছলতা নিয়ে এসেছে। সম্ভবত সে-কারণেও এই গ্রন্থের এককুড়ি সাতটি কবিতাকে দ্রুত নিশ্বাসে পড়ে ফেলা যায়। শব্দের বাহাদুরী ব্যবহার, অক্ষরবৃত্তের ওস্তাদি কারুকাজ, লোকজ চিত্রের প্রয়োগÑ রুদ্রের কবিতার এসব পরিচিত উপসর্গ এ-গ্রন্থটিকেও অলঙ্কৃত করেছে।২২

এর দিনকয়েক পরে ‘সিম্ফনী’ পত্রিকায় সুবিনয় রেজা ছদ্মনামে প্রাবন্ধিক রেজা সেলিম এই বইটির আলোচনায় বলেন,

তরুণ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থ ‘ফিরে চাই স্বর্নগ্রাম।’ ‘স্বর্নগ্রাম হচ্ছে আমাদের ইতিহাস, জাতিসত্তা আর প্রেরনাময় ঐতিহ্যের প্রতীক। স্বর্নগ্রাম বাঙালির আত্মার নাম, রক্তের নাম’- রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর বর্তমান গ্রন্থের কাব্যাদর্শ এই উদ্ধৃতিতে স্পষ্ট (উদ্ধৃতি : ভূমিকা)।

বাঙলা কবিতার সাম্প্রতিক ধারায়, বাঙালির প্রেরণাময় ঐতিহ্যে শিকড় বিস্তার এর লক্ষ্য, এই প্রথম স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রকাশ পেলো, আত্মানুসন্ধান ও স্বরূপ অন্বেষণের অন্তর্তাগিদ ও মর্মপীড়াসমূহ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ উপস্থাপিত করেছেন নতুন আঙ্গিক ও পরীক্ষামূলক ভাষারীতির মাধ্যমে। বেশ কিছু অচলিত ও লৌকিক শব্দ তাঁর কবিতার বিষয় অনুসারে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে, এবং প্রায় প্রতিটি কবিতার ক্ষেত্রেই, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এক নতুন কাব্য-জগত সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছেন, যাতে আবহমান বাঙলা ও বাঙালি জীবন ঘরোয়া পরিধি থেকে উন্মোচিত হয়েছে সাহিত্যের বিশাল প্রান্তরে। অবশ্য রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর আর কোনো উপায় ছিলো না। এই স্থির আত্মানুসন্ধানী অস্তিত্বের, নিজের প্রেরণাময় ইতিহাস, অর্থাৎ ‘স্বর্নগ্রাম’-এর মানচিত্র অন্বেষণ ব্যতীত ভুল আদর্শের নির্মাণ কি সম্ভব?২৩


কাছাকাছি সময় সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’-য় নূরউল করিম খসরু লেখেন-

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর দ্বিতীয় কবিতার বই ‘ফিরে চাই স্বর্নগ্রামে’ ২৯টি কবিতা সংকলিত হয়েছে। ভূমিকায় কবি বলেছেন : ‘বৃক্ষের বিকাশের জন্যে যেমন মাটিতে শিকড় বিস্তার করা প্রয়োজন। একটি জাতির বিকাশের জন্যেও তেমনি প্রয়োজন তার মাটিতে আর ইতিহাসে, সাহিত্যে, শিল্পে, দর্শনে, বিজ্ঞানে তার প্রেরনাময় ঐতিহ্যে শিকড় বিস্তার করা।’ বইয়ের কবিতাগুলিতে সেই ঐতিহ্য অন্বেষণের আকাক্সক্ষা লক্ষ্য করা যায়। যেমন : মুহূর্তের চূর্ন পরমাণু ডেকে বলে : ওই দ্যাখরে অবোধ/ওই তোর হারানো অতীত, ওই তোর পরানের ভূমি।/কিছু তুই চাষাবাদ শেখ, শিখে রাখ জমিনের ভাষা/গর্ভিনী রমনী তোর এই ক্ষেতে বুনেছিল ফসলের বীজ/এই ক্ষেতে রমনীর তামাটে শরীর আর সুকল্যান বাহু/একদিন শস্যের সুগন্ধ মেখে ফিরে গেছে অঙনের নীড়ে। [নিখিলের অনন্ত অঙ্গন] সেজন্যই, হয়তো পরবর্তীতে তাঁর নিভৃত মনোলোকের একান্ত ইচ্ছাটি বাণীবন্ধ হয়েছে এরকম : সত্যের লাঙল চিরে এই পোড়া বুকের জমিন/আমিও ফসল হবো, হবো আমি শস্যভরা ক্ষেত/সোনালি অঘনে তুমি আঁটি আঁটি ধান তুলে নিও। [ঐ]

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতায় আবেগ, প্রেম, নস্টালজিয়া ও ঐতিহ্য অহংকার উপজীব্য হলেও বারবার উঁকি দেয় মানুষ, সেই মানুষ পোড়-খাওয়া, তামাটে এবং গ্রামীণ। যাদের সারা জনম কাটে শস্য ফলনে, অথচÑ তেজি কব্জায় জমি চষে আমি ঘরে তুলে নিই ব্যথা,/ঘরে তুলে নেই হাহাকারে ভরা অনাহারী দিনমান। [গহিন গাঙের জল] মূল সামাজিক দায়িত্ব সম্পাদনের চেতনা তাঁর কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে উজ্জ্বল। তাছাড়া ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টির জীবন কবিতায় চিত্রিত হয়েছে বেশি। তাঁর জীবন-উপলব্ধির সহজিয়া প্রকাশভঙ্গিটিও উল্লেখযোগ্যতার দাবি রাখে : ১। উদোম জীবন উল্টে রয়েছে মাঠে কাছিমের মতো [হাড়েরও ঘরখানি] ২। অরন্য জীবন নেই আজ আছে জীবনে অরন্য/পশুরা গিয়েছে বনে সে ভূমিকা নিয়েছে মানুষ। [খামার]। উপলব্ধির এই তীক্ষè উৎকর্ষ তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রেম এবং রোমান্টিক উচ্চারণেও তিনি সংহত আবেগ ও নিষ্ঠার পরিচয় রেখেছেন। যেমন : শিথানে আমার ধূপে চন্দনে পাপ/রক্তে আমার কালো সময়ের ক্লেদ/নষ্ট চাঁদের পুন্নিমাহীন নিষ্ফলা প্রান্তর/নষ্ট জীবন তোমাকে দেব না প্রিয় [পরাজিত প্রেম]।

অবশ্য রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কবিতার বিষয়বস্তু নির্বাচন ও বক্তব্য উপস্থাপনে যতটুকু একাগ্র ও সংযমী, কবিতার নির্মাণ-শৈলী ও শব্দ-ব্যবহারে ততটুকু সচেতন বলে মনে হয় না। বিষয় ও মেজাজের পুনরাবৃত্তিও প্রায় কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। ‘নগরীর রুখো গ্রাস থেকে সেই গ্রামখানি মোর/দুধভাত, মিঠে, রূপশালি ধান সেই গ্রামখানি/কেড়ে নিতে চাই, কেড়ে নিতে চাই, কেড়ে নিতে চাই।’ [কাচের গেলাশে উপচানো মদ]। আসলে, কবি-চৈতন্যের এই সবুজ শুভ্র আকাক্সক্ষাটি এই গ্রন্থে বিভিন্নভাবে বিধৃত হয়েছে। তবে ভাষা ও কণ্ঠস্বরের পৃথকতা অর্জনের জন্যে তাঁর আরো সচেষ্ট হওয়া যেন প্রয়োজন।

অন্যদিকে, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই একটি বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন বইটিতে। তার নিজের ভাষায় : ‘দুটি ন-এর পরিবর্তে এই গ্রন্থে শুধু দন্ত্য ন ব্যবহার করেছি।’ ভাষাবিজ্ঞানের ওপর তার এরকম স্বপ্রণোদিত স্বেচ্ছাচার কতটুকু বিজ্ঞানসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সে-সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ হয়েছে। তবু রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘ফিরে চাই স্বর্নগ্রাম’ আমাদের কবিতায় একটি বিশিষ্ট সংযোজন।২৪


এই দ্বিতীয় গ্রন্থে রুদ্র যেমন সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়েন, তেমনি তাঁর পাঠকপ্রিয়তাও হয়ে পড়ে ঈর্ষণীয়। তিন বছর পরে প্রকাশিত হয় সাড়া-জাগানো গ্রন্থ ‘মানুষের মানচিত্র’ (১৯৮৪)। এর মধ্যে ১৯৮২ সালের মধ্য-ফেব্রুয়ারিতে স্বৈরাচারী-বিরোধী আন্দোলনে দেশের সংস্কৃতিকর্মীরা একজোট হয়ে রাজপথে নামে, তখন ৪২টি সাংস্কৃতিক সংগঠন মিলে গঠিত হয় ‘সংগ্রামী সাংস্কৃতিক জোট’। রুদ্র ছিলেন এই জোটের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। এই জোট পরবর্তীকালে সুসংহতভাবে ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’ নামে অগ্রসর হয় এবং এখনো এর তৎপরতা অব্যাহত।

১৯৮৬ সালে তাঁর চতুর্থ কাব্য ‘ছোবল’ প্রকাশিত হয়। ১৯৮৭ সালে স্বৈরাচারী সরকারের উদ্যোগে ‘এশীয় কবিতা উৎসবে’র আয়োজন করা হয়, যেখানে প্রতিক্রিয়াশীল এবং সুবিধাবাদী কবিরাই ছিলেন অগ্রণী। এর প্রতিবাদে উদযাপিত হয় ‘জাতীয় কবিতা উৎসব’। প্রথম জাতীয় কবিতা উৎসব আয়োজনে রুদ্র প্রধান ভূমিকা পালন করেন এবং উৎসব কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় জাতীয় কবিতা উৎসবেও রুদ্রের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। কিন্তু তৃতীয় জাতীয় কবিতা উৎসবে রুদ্রের সঙ্গে কয়েকজন কবির মতানৈক্য হয়। মঞ্চে কবিতা পড়ার সময় রুদ্র বলেন, ‘আমার কবিতা স্বৈরাচারী সরকার এবং কবিতা পরিষদের ভেতরে সকল প্রকার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে’। তাঁর এই সৎ ও সাহসী বক্তব্য অনেকেই মেনে নিতে পারেন নি। তাঁকে শারীরিকভাবে আক্রমণের হুমকি দেয়া হয়। রুদ্র প্রচ- অভিমানে নিজের গড়া সংগঠন থেকে নীরবে সরে পড়েন।

১৯৮৮ সালে নিজ গ্রামে গড়ে তোলেন ‘অন্তর বাজাও’ নামের একটি গানের সংগঠন। বিশিষ্ট শিল্পী গোলাম মহম্মদের তত্ত্বাবধানে রুদ্রের রচিত গানগুলি তারা পরিবেশন করে। ইতোমধ্যে বেরিয়ে গেছে তাঁর পঞ্চম কাব্য ‘গল্প’ (১৯৮৭) এবং ষষ্ঠ কাব্য ‘দিয়েছিলে সকল আকাশ’ (১৯৮৮)। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সপ্তম এবং জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষকাব্য ‘মৌলিক মুখোশ’। এটিও প্রশংসাধন্য হয় সর্বমহলের। বিশিষ্ট সমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লেখেনÑ

মানুষ ও মনুষ্যত্বের কাছে রুদ্র ছিল অঙ্গীকারবদ্ধ। তার কবিতার বই পড়লে মনে হয় সমাজকে ‘আমূল’ বদলে ফেলতে, মানুষকে তার স্বপ্নের সমান করে গড়ে তুলতে, কবিতাকে জীবনের প্রধান চালিকাশিক্তিতে পরিণত করতে তার ছিল সারাজীবনের অঙ্গীকার। ‘মৌলিক মুখোশ’-এ এসে রুদ্র অনেক সংহত হয়েছে। তার প্রকাশ সুষম এবং সংযত হয়েছে বহুগুণ। আগে যেখানে অস্থিরতা এবং উচ্ছ্বাস তাকে বহু কথা বলিয়ে নিয়েছে, যার অনেকটা চলে গেছে অতিকথনের পর্যায়ে। ‘দিয়েছিলে সকল আকাশ’-এর নমিত সুর, আত্মমগ্ন কবিতাগুলো এক ভিন্ন রুদ্রকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। যে রুদ্র দিনের আলোর নিচে অন্ধকার ছায়াকেও দেখতে জানে, যার বিপ্লবের বারুদ ও ধোঁয়া আড়াল করে না ভালোবাসার শব্দকে। রুদ্র তার নিজস্ব একটি ভাষা নির্মাণ করছিল ক্রমাগত, যে ভাষা, আমার বিশ্বাস, অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিকÑ যদিও বরাবরের উচ্চকিত প্রকাশ তাতে পর্যাপ্তভাবেই ঘটেছে।

রুদ্রের একটি সমস্যা ছিল, আমার কাছে মনে হয়েছে সে খুব উচ্ছ্বসিত বোধের প্রকাশ ঘটাত কবিতায় এবং ভাষাকে সেইভাবে গড়িয়ে যেতে দিয়েছে। এজন্য অনেক কবিতায় চিন্তা, চিত্রকল্প এবং ছন্দের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। মাঝেমধ্যে সে বুঝতে পারতো এই পৌনঃপুনিকতা, এই ভড়ৎসধষরুধঃরড়হ-এর বিষয়, তাই অনেক কবিতায় বেরিয়েও এসেছে, ‘মানুষের মানচিত্র’ তেমন একটি নতুন প্রয়াস; অনেক চমৎকার বিষয় জড় হয়েছে এই বইটিতে।

বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনেক চিন্তা ছিল, ক্রোধ এবং হতাশা ছিল, কিন্তু এই প্রত্যাশাও তার কবিতায় ছিল যে সময়ের সঙ্গে সমান্তরাল যদি মানুষের পদযাত্রা এগিয়ে যায়, সে মানুষ ইতিহাসের কাছে পরাস্ত হয় না। তার কবিতায় ইতিহাস কোনো মিথ্যা পাঠ দেয় না, ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করে না কোনো অলীক মোহÑ অত্যন্ত নির্মোহভাবে বর্তমানের সকল ভূমিকে পর্যবেক্ষণ করেছে সে। তার ভবিষ্যতের আশাবাদ বাস্তবের ঐ ভূমিতে শিকড় মেলেছে। রুদ্রের কবিতার প্রধান কালটি বর্তমান, প্রধান শক্তিটি সংগ্রামের, সংঘাতের; প্রধান পুলকটি ঐ সংগ্রাম ও সংঘাতের পর বিরল কোনো অর্জনের।

তার কবিতা একান্তই নিজের সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো বোঝাপড়া, বিবাদ, কলহ অথবা অভিমান। ‘মানুষের মানচিত্র’-এর ভেতরের সাদা পাতায় সে আমাকে জানাচ্ছে, ‘এই ব্রহ্মান্ডের ভেতর একটি বিন্দুর মতো আমি একা।’ এটি তার একটি কবিতা থেকে উদ্ধৃতি। সকল কবিতার পরোক্ষে ঐ একাকী নির্জনে কবির আনাগোনা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, এই একাকীত্ব সত্ত্বেও রুদ্রের কবিতার ক্যানভাস যতটা অনাবিল, ততটা কোলাহলে পূর্ণ। তার কবিতায় শুধুই মানুষ, শুধুই পরিকীর্ণ নিসর্গ, শুধু উচ্ছ্বাস, দ্রোহ, কলরোল।২৫


এছাড়া রুদ্র ‘বিষ বিরিক্ষের বীজ’ নামে একটি কাব্যনাট্য লিখেছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। ‘খুটিনাটি খুনশুটি’ শিরোনামে ১৭টি কবিতা লিখেছেন। এরকম ৩২টি কবিতা লিখে বই করার পরিকল্পনা ছিল।

শেষদিকে রুদ্র স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। জড়িয়ে পড়েছিলেন সঙ্গীত পরিষদের কর্মকা-ে। বাংলাদেশ সঙ্গীত পরিষদের কার্যনির্বাহী পরিষদ ১৯৯১-’৯৩-এর প্রকাশনা সচিব নির্বাচিত হন। এই পরিষদের সভাপতি ছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীত-পরিচালক সমর দাস এবং মহাসচিব ছিলেন গীতিকার মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান। পরিষদের পক্ষ থেকে ‘মানুষের জন্যে মানুষ’ শীর্ষক একটি স্মরণিকা প্রকাশিত হয় রুদ্রের সম্পাদনায়। রুদ্র তখন মনে-প্রাণে গান নিয়ে ব্যস্ত। প্রচুর গান লিখেছেন, সুর করেছেন। ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর ক্যাসেটসহ বিভিন্ন ক্যাসেটে তাঁর রচিত গান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একদিন কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালকে বলেছিলেন, ‘দুলাল, কবিরা গান লিখলে গানের গুণগত মান এবং ধারার পরিবর্তন হবে।’২৬ রেডিও এবং টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার হওয়ার চেষ্টাও তিনি করেছিলেন। কবি নাসির আহমেদ তাঁর স্মৃতিচারণায় এ-সম্পর্কে লিখেছেন-

... রুদ্র বললো যে, সে রেডিও-টিভির অন্তর্ভুক্ত গীতিকার হতে চায়; পা-ুলিপি তৈরি আছে, আমি যেন পা-ুলিপিটা দেখে সংশ্লিষ্ট জনৈক কর্মকর্তার মাধ্যমে তালিকাভুক্তিটা দ্রুত করিয়ে দিই। সে সময় এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। রুদ্রও হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কথামতো রুদ্র তার সেই পা-ুলিপি আমাকে আর পৌঁছাতে পারে নি।২৭


রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বেশকিছু ছোটগল্পও লিখেছিলেন। এ-যাবৎ নয়টি গল্পের সন্ধান পাওয়া গেছে। রুদ্র তাঁর সাহিত্য-জীবনে প্রায় প্রতিটি জেলায় গেছেন কবিতা পড়তে। কখনো কবিতা পরিষদের কাজে, কখনো স্বতন্ত্র সাহিত্য-অনুষ্ঠানে। একবার গিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। প্রাবন্ধিক শান্তনু কায়সার জানিয়েছেন-

আশির দশকের শুরুতে, রুদ্র তখন ছাত্র, হুদা ও রুদ্র কবিতা পড়তে এলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আমাদের সংস্থা ‘ঋত্বিক’ তখন ইবনে সিনা, কার্ল মার্কস এবং আইনস্টাইনের উপর অনুষ্ঠান করে সাড়া জাগিয়েছে। স্থানীয় তরুণেরা দুজনের কবিতাই পড়েছে। ওদের মনে নানা জিজ্ঞাসা। স্বভাবতই রুদ্রকেও ওরা বিভিন্ন প্রশ্ন করল। রুদ্র কিছুটা বিব্রত বোধ করেছিলেন। কিন্তু আমরা উৎসাহ দিলাম। উদাহরণ সহযোগে সঙ্গীতের আলোচনা বলতে যা বোঝায়, সেদিন কবিতা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে রুদ্র তা-ই করেছিলেন। যে সমাজ-বাস্তবতা সাধারণভাবে অনুবাদিত হয় তাঁর পঙক্তিমালায়, সেদিনও তাই ঘটায়। তরুণদের ওর কবিতা পড়া টেনেছিল খুব।২৮

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ জীবদ্দশায়ই তাঁর কাব্যকীর্তির স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর সময়ের আর কোনো কবি এতটা আলোচিত এবং নন্দিত হন নি।


সাময়িকপত্র সম্পাদনার জগত


কবিতা-রচনার পাশাপাশি সাময়িকপত্র সম্পাদনার ক্ষেত্রেও রুদ্র ছিলেন সমান মনোযোগী। তাঁর সম্পাদিত কোনো পত্রিকাই দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। কিন্তু একথা স্পষ্ট যে, একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি সম্পাদনাকর্মে ব্রতী হয়েছিলেন। বলা যায়, তাঁর কবিতাকর্ম এবং সম্পাদনাকর্ম প্রায় একই সময়ে শুরু হয়েছে। স্কুলজীবনেই তাঁর সম্পাদনায় প্রথম যে-সংকলনটি বেরিয়েছিল তার নাম ‘দুর্বিনীত’। পরবর্তীকালে ‘অনামিকার অন্য চোখ ও চুয়াত্তোরের প্রসব যন্ত্রনা’, ‘অশ্লীল জ্যোৎস্নায়’, ‘স্বরূপ অন্বেষা’, 'poiema' প্রভৃতি সাহিত্যপত্রের সম্পাদক এবং ‘সাহস’ নামের একটি সাহিত্যপত্রের প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দুর্বিনীত : ১৯৭৩ সালে, রুদ্রের বয়স তখন সতের, বের করলেন ‘দুর্বিনীত’ নামের একটি সাহিত্য-সংকলন। রুদ্র তখন ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলের ছাত্র, এসএসসি পরীক্ষার্থী। এটি ছিল একুশের সংকলন। প্রকাশকাল লেখা ছিল ‘আটই ফাল্গুন, ১৩৭৯’। প্রকাশক হিসেবে মুদ্রিত হয়েছে ‘দুর্বিনীত শিল্প সাহিত্য গোষ্ঠী’র নাম। রুদ্র ছিলেন এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। তখনো তিনি ‘রুদ্র’ নাম গ্রহণ করেন নি। এই সংগঠনের ঠিকানা ছিল রুদ্রের মামার বাসাÑ ৫০, লালবাগ। রুদ্র তখন এই বাসায় থাকতেন। ‘দুর্বিনীত’ সংকলনটি ছাপা হয়েছিল মিছ-ওয়ান প্রিন্টার্স, ১৫/এফ আজিমপুর রোড, ঢাকা থেকে। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন রুদ্র এবং ইকবাল হাফিজ। প্রকাশনায় যাঁরা সহযোগিতা করেছেন তাঁরা হলেনÑ হেলাল আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমান, আতিকুল আলম, ইকরামুল হুদা, জাহিদ রেজা সানি, মাসুদ আহমেদ, মাহবুব ইফতেখার, ফারুক আহমেদ ও ইরশাদুল্লাহ। ‘দুর্বিনীত’-র ঘোষণা হিসেবে ছাপা হয়েছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ‘আমি চির দুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস...’ থেকে প্রথম সাতটি চরণ। বোঝা যায় ‘দুর্বিনীত’ নামটি নজরুলের কবিতা থেকেই গৃহীত হয়েছিল। আর সম্পাদকীয় হিসেবে ছাপা হয়েছিল ‘দুর্বিনীত’ নামে একটি কবিতা। কবিতাটি হুবহু উদ্ধৃত হতে পারে-

দুর্বিনীত


মুহম্মদ শহিদুল্লাহ


আমি দুর্বিনীত নির্ভীক সৈনিক;
জন্মেছি এঁদো বস্তির দুর্গন্ধতায়
অন্ধকার কালরাতে জলন্ত স্ফূলিঙ্গ যেনÑ
প্রচ- এক বুক উত্তপ্ত নক্ষত্র।

দ্বন্দ্বের মুখোমুখি ভাঙ্গনের উল্লাসে
আমি অট্টহাসে কাঁপাই ভুবন,
শোষণের স্বর্ণলঙ্কা পোড়াই
লেজের বীভৎস হনুমান অগ্নিতে।
ঘুনে ধরা সমাজের ঘরখানা
পদাঘাতে ভেঙ্গে ফেলি চুরমার
আমি শাসন শোষণ ভয় করি না।

আমি শ্মশানে কবরে শত
মৃতের বুকে বিদ্রোহ আনি,
পৃথিবীর সহস্র পুনর্জন্মে
আমি নির্বিঘেœ জন্ম নেই,
আমি অমর পাপিষ্ঠÑ আমি মরি না।
তোমাদের বিশ্বাসী স্রষ্টার কলিজা
ছিঁড়ে ফেলে পান করি এক বুক রক্ত।
ধর্মের কণ্ঠনালী ভেঙ্গে
পান করি দুর্গন্ধ পুঁজÑ
বিষাক্ত এ পাপিষ্ঠ মুখে।



কবিতাটি রুদ্রের কচিহাতের লেখা। নজরুল-প্রভাবিত এই কবিতায় মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘দ্রোহী’ ও ‘রুদ্র’ রূপটি ধরা পড়ে। এরপর থেকেই তিনি নামের আগে ‘রুদ্র’ শব্দটি জুড়ে দেন। সংকলনটির সম্পাদনার যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেছেন রুদ্র। কিন্তু তাঁর নাম ছাপা হয়েছে ‘সম্পাদক সহযোগী’ হিসেবে। সম্পাদক হিসেবে নাম ছাপা হয়েছে ‘দুর্বিনীত শিল্প সাহিত্য গোষ্ঠী’-র সভাপতি মিয়া মোহম্মদ মনিরুজ্জামান-এর। ইনি ছিলেন রুদ্রের স্কুল-শিক্ষক।

অনামিকার অন্য চোখ এবং চুয়াত্তোরের প্রসব যন্ত্রনা : রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সম্পাদিত দ্বিতীয় সাময়িকী হচ্ছে ‘অনামিকার অন্য চোখ এবং চুয়াত্তোরের প্রসব যন্ত্রনা’। প্রকাশকাল ১৯৭৮ সালের শহিদ দিবস। পত্রিকায় উল্লেখ ছিল ‘আটই ফালগুন ত্যারোশো আশি’। এটি ‘আমরা পদাতিক সম্প্রদায়’-এর পক্ষ থেকে তমদ্দুন প্রেস, ৫০ লালবাগ থেকে মুদ্রিত, প্রকাশিত ও প্রচারিত। সম্পাদনা-সহকারী ছিলেন আহমেদ হেলাল। এই সংকলনের সঙ্গে রুদ্রের যে-সব বন্ধু ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তাঁদের প্রত্যেকের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য মুদ্রিত ছিল। যেমন :

জীবনের বিধ্বস্ত পা-ুলিপিখানা নোতুন আংগিকে সংশোধন কোরতে চাই।- শাহজান মাখন
সোনার হরিণ চাই না, মাটির কাছাকাছি যাবো।- মাহমুদ হাসান
মুখোমুখি হোতে হবে জেনেই এ্যাতোটা দুঃসাহসী হোতে পেরেছি।- ইকবাল আহমেদ দুলু
প্রতিবন্ধকতার জলোচ্ছ্বাস আমার নিপুণ ভিত টলাতে পারবে না। সংশপ্তক প্রত্যয়ে নিষিদ্ধ পদাতিক হবো।- আহমেদ হেলাল
অন্য চোখ আছে বোলেই অনামিকা তোর বুকের উত্তপ্ত সোঁদা ঘ্রানে চিরকাল বুনবো প্রেমের বীজ আমি তুখোড় তুমুল জারজ।- রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ


সম্পাদকীয় হিসেবে ‘একুশ তুই আর আসিস না’ এবং ‘উপলব্ধির সাদা কালো’ নামে দুটি রচনা প্রকাশিত হয়েছে। নাম উল্লেখ করা না-হলেও কারো বুঝতে বাকি থাকে না যে রচনা দুটি লিখেছিলেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ নিজেই। এই রচনা দুটিতে রুদ্রের সাহিত্য সম্পর্কিত চিন্তা-ভাবনার ছায়া পড়েছে। রুদ্রের সাহিত্যজীবনের উষাকালের খবর জানতে এ-দুটি রচনা সহায়ক হতে পারে। এখানে বানান-সম্পর্কিত নতুন চিন্তার প্রকাশ রয়েছে। উদ্ধৃতিতে রুদ্র-ব্যবহৃত বানান-ই অক্ষুণœ রাখা হল।

একুশ তুই আর আসিস না



ক্যানো আসবি, কার কাছে আসবি? তোর বুকের গরোম রক্তের স্পর্শে একদিন নিষিদ্ধ বিক্ষোভ হোয়েছি। অপ্রতিরোধ্য ব্যারিকেড গোড়েছি। কৃষ্ণচুড়ার বিক্ষুব্ধ লাল ছুঁড়ে দিয়েছি তোর সুনীল করতলে। কিন্তু আজ তোর খোঁপায় রজনীগন্ধা অথবা স্মিত হাসি ভালো লাগে না আর। আমরা তোর অন্তর্বাসে হাত দিয়েছি। কী কোরবো বল, কিছুই পাই নি যে আমরা! মেনড্রাক্স আজ একমাত্র সংগীÑ সম্বল একবুক জারজ স্মৃতির বিষ। তোর মর্যাদা দেবার মতো কিছুই নেই।

আর আসিস নে হতভাগী। সত্যি বোলছি এবার এলে নিশ্চয়ই তুই সতীত্ব হারাবি।


‘উপলব্ধির সাদা কালো’ রচনাটি এর পাশাপাশি ভিন্ন পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল। উপলব্ধির ভিন্নতা বোঝাতে হয়তো এরকম করা হয়েছিল। লেখাটি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে-

উপলব্ধির সাদা কালো



নিশ্চয়ই। যোদি কিছু ভুল দৃষ্ট হয় তীব্র সমালোচনা করুন। উৎসাহ পাবে, উদ্দীপনা বাড়বে। অনর্থক শিশুসুলভ স্নেহের প্রত্যাশী নই। নিশ্চয়ই চোখে পোড়বে অনেক স্থানেই অশ্লীল শব্দ ব্যবহৃত হোয়েছে। কী কোরবো বলুন আমরা সকলেই যে ভদ্রবেশী অশ্লীলতার পরোম পূজারী। অস্বীকার কোরতে পারবেন? সাহিত্যে অশ্লীলতা অনাবশ্যক বোলে তর্কো কোরতে পারেন কিন্তু জাগতিক জীবনে কী অশ্লীলতা নিষিদ্ধ কোরতে পারবেন? যেহেতু জীবন এবং জগৎ বাদ দিয়ে সাহিত্য অসম্ভব তাই সাহিত্যে অশ্লীলতা অনাবশ্যক নয় বরং জীবনকে বেঁধে রাখার নিপুণ প্রয়াস।

হয়তো প্রতিবাদ কোরবেন অনাবশ্যক দুঃশ্চিন্তায় নরোকগামী হোচ্ছি। তবে স্বীকার আপনাকে কোরতেই হবে যে গতানুগতিকতার চিরশত্রু ব্যতিক্রমধর্মী আমরা স্পষ্টতই অসম্ভব দুঃসাহসী।

আবহমান এই বাংলায় একদিন স্বাচ্ছন্দ্যের স্বচ্ছ বাতাস ছিলো। সোনালী সম্ভাবনার সবুজ পাল তুলে ভেসে যেতে দৈনন্দিন আশার রূপোলী নদীতে। শালিকের ধূসর চোখ কাকের মসৃণ পালোক আশ্বিনের ভরা ক্ষেত বৈশাখের মাতাল বাতাস আর অনংগ বধূর সিঁথির সিঁদুর নিয়ে একটি নিবিড় সঙসার পেতেছিলো আজীবন দুঃখিনী এক মা।

হঠাৎ একদিন আকাশে মেঘ উঠলো সমস্ত সবুজ ওরা কেড়ে নিতে চাইলো। আমরা চিৎকার কোরলাম নিজস্ব কণ্ঠে। ওরা শেকল দ্যাখালো। আমরা কারাগার চিনলাম বিক্ষোভের লাল ঠোঁটে চুমু খেলাম। মৃত্যুর সাথে সংগম কোরলাম আজন্ম সম্পর্কে, তাই মেঘ গাঢ় কালো হোলো। আর মেঘের ভেতোর সঞ্চিত হোতে থাকলো বিক্ষুব্ধ বজ্র। আসন্ন ভাংগোনের সম্ভাবনা।

মেঘে ঢাকা সূর্য মুক্ত হোলো। কিন্তু তখোন সমস্ত সবুজগুলো পুড়ে গ্যাছে। সে নিবিড় সংসারে অভাবের টর্নোডো, সমস্যার মহামারী আর যন্ত্রনার শ্মশান হোলে বুকের কাছাকাছি কবর শিয়রে জেগে আছে।


এই সংখ্যায় শহীদুল্লাহ কায়সার, হাসান হাফিজুর রহমান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, আবদুল গনি হাজারী, আবু কায়সার, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা, উমাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, দাউদ হায়দার, মখদুম মাশরাফী, মিয়া মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ওমর আলী এবং রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা ছাপা হয়েছে।

অশ্লীল জ্যোৎস্নায় : অনিয়মিত কবিতাপত্র পরিচয় নিয়ে ‘অশ্লীল জ্যোৎস্নায়’-এর ১ম বর্ষের ১ম সংখ্যা বেরিয়েছিল ১৯৭৫ সালে ফেব্রুয়ারিতে। এর একটি মাত্র সংখ্যাই প্রকাশিত হয়েছিল। এর সহকারী সম্পাদক ছিলেন আহমেদ হেলাল। প্রকাশনায় পদাতিক সম্প্রদায়ের সাহিত্য বিভাগ। কার্যালয়ও ছিল পূর্ববৎÑ ৫০ লালবাগ, ঢাকা। এই পত্রিকার মাধ্যমে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সাহিত্যের একটি নতুন সংযোজন হিসেবে ‘উপলিকা’ রচনায় ঘোষণা দিয়েছিলেন। লক্ষ্য করা যায় যে, মূর্ধণ্য ‘ণ’ বর্জনের প্রবণতা থাকলেও এ লেখাদুটিতে তা ঘটে নি। ‘উপলিকা’ সম্পর্কে তাঁর নিজের ব্যাখ্যা ও ঘোষণা এখানে তুলে ধরা যায়-

উপলিকা সম্পর্কিত উপস্থাপনা



না কবিতা। না গল্প। সুরটা হবে কাবিতিক। এবং উপস্থাপনাটা হবে গাল্পিক। মূলত কবিতার স্বচ্ছন্দ গতি নিয়ে এর শুরু এবং গল্পের বিন্যাসে বিন্যস্ত। জটিলতা সবসময় পরিত্যাজ্য। যতোটা সম্ভব তার ধারাবাহিকতা আবশ্যক। সমাপ্তিটা ছোটগল্পের মতোন। সহজ শব্দের ব্যবহার বাঞ্ছনীয়।

নিঃসন্দেহে সাহিত্যে এটা একটা নোতুন সংযোজন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘ক্ষমা নেই’ গ্রন্থের রচনাগুলোয় অবশ্য উপলিকার গুণগত দিক থেকে সাদৃশ্য রয়েছে। তবে ঐ রচনাগুলোর প্রথম অবস্থায় খুব একটা উদ্বিগ্নতা ছিল না, য্যামোন থাকে না রচনাটা শেষ হলে।

উপলিকার প্রধান উপজীব্য হচ্ছে রচনার প্রথম থেকে পাঠককে যে পরিবেশ বা যে ধারণার মাঝে নিয়ে যাওয়া হবে ঠিক শেষ মুহূর্তে সেই পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ নোতুন একটা পরিবেশ বা অবস্থানে পাঠককে ছুঁড়ে দিতে হবে। অর্থাৎ ঠিক সেই নোতুন পরিস্থিতির কথা না বলা পর্যন্ত পাঠক সে-সম্পর্কে সামান্যতম আভাসও পাবে না। তাই সে বিষয়বস্তু ভাবগত হোক আর বস্তুগত হোক।

এ দেশের আবদুল মান্নান সৈয়দের কয়েকটা কবিতাকে মোটামুটিভাবে উপলিকা বলে ধরা যেতে পারে। কিন্তু ঐ একই কারণে সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না। তাছাড়া সৈয়দের কবিতায় দুর্বোধ্য শব্দের ব্যবহার একটু বেশি।

ফরহাদ মজহারের কয়েকটি কবিতায় উপলিকার কিছু কিছু গুণ লক্ষ্যণীয়। আবুল হাসানেরও তাই।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বেশির ভাগ কবিতাকেই উপলিকা বলা যেতে পারতো, যদি না ঐ কবিতাগুলোয় কবিতার ঘ্রাণ একটু কম থাকতো।

উপলিকার আর এটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ কোরছি। তা হলো এর আকার খুব বেশি দীর্ঘ করা যাবে না। মোটকথা উপলিকা হোচ্ছে না-গল্প না-কবিতা।

এরপরে সম্পাদকীয় ঘোষণা হিসেবে লেখা হয়-

উপলিকা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা এবং এ-সম্পর্কে লেখকদের মতামত আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে।

যে-কোনো লেখকই ‘উপলিকা’ বিভাগে লেখা পাঠাতে পারবেন। সেগুলো উপলিকা হতে হবে।

সবশেষে নমুনা হিসেবে ‘একটি মারাত্মক স্বপ্নভুক দিন’ এবং ‘একদিন ওনামে কাউকেই চিনতাম না’ শীর্ষক দুটি উপলিকা প্রকাশিত হয়েছে। রুদ্র ছাড়াও এ-সংকলনে কবিতা লিখেছেন আলাউদ্দিন আল আজাদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, মাকিদ হায়দার, দাউদ হায়দার, কামাল চৌধুরী প্রমুখ।

স্বরূপ অন্বেষা : আলী রীয়াজ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এবং মঈনুল আহসান সাবের যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন ‘স্বরূপ অন্বেষা’ নামের একটি প্রবন্ধ-সংকলন। এঁরা তিনজনেই সত্তর দশকের সাহিত্যে শীর্ষস্থানীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর আলী রীয়াজ প্রাবন্ধিক হিসেবে, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কবি হিসেবে এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা-র সাবেক সহকারী সম্পাদক মঈনুল আহসান সাবের কথাসাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিমান। ১৯৭৮ সালের মে মাসে সংকলনটি প্রকাশ করেছিলেন তিতাস প্রকাশনী, ৪ শান্তিনগর বাজার, ঢাকা ১৭-এর পক্ষে নীয়াজ আহমেদ। ছাপা হয়েছিল শিলালিপি মুদ্রায়ণ, ৪৫/৩ রামকৃষ্ণ মিশন রোড থেকে। প্রচ্ছদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল কাজী হাসান হাবীবের করা নামলিপি এবং কামরুল হাসানের করা উডকাঠের প্রতিলিপি। ‘স্বরূপ অন্বেষা’য় প্রবন্ধ লিখেছিলেন আবিদ রহমান (সাম্প্রদায়িকতা), সলিমুল্লাহ খান (শিক্ষার সংকট), আলী রীয়াজ (বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ) এবং মোরশেদ শফিউল হাসান (কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা : চূর্ণচিন্তা)।

সাহস : ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত হয় ‘সাহস’ নামের একটি কবিতা-সংকলন। এর প্রিন্টার্স লাইনে লেখা হয়েছে, ‘রাখাল প্রকাশনীর পক্ষে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কর্তৃক সিদ্ধেশ্বরী সড়ক, ঢাকা ১৭ থেকে প্রকাশিত।’ অর্থাৎ রুদ্র এখানে সম্পাদক নন, প্রকাশক। সম্পাদক হিসেবে ছাপা হয়েছিল আলী রীয়াজ ও সাজ্জাদ হোসেনের নাম। এ-সংকলনে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ছাড়াও জাফর ওয়াজেদ, সাজ্জাদ হোসেন, কামাল চৌধুরী প্রমুখের কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

Poiema : Poiema-এর একটিমাত্র সংখ্যা বেরিয়েছিল ১৯৮০ সালের মার্চ মাসে। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ছিলেন এর যুগ্মসম্পাদক (joint editor)। সম্পাদক মুহম্মদ নূরুল হুদা, নির্বাহী সম্পাদক মুহম্মদ সিরাজুল হক, সহকারী সম্পাদক কাজী রোজী ও মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস, ডিজাইনার রাজা মিয়া। প্রকাশক শাহানা হুদার ঠিকানা ৬৬/১ জামাল খান রোড, চট্টগ্রাম উল্লিখিত হলেও এটি ছাপা হয়েছিল শাহাজাহান প্রিন্টিং ওয়ার্কস ৯৭/২ সিদ্দিক বাজার, ঢাকা থেকে। এর সম্পাদকীয় দপ্তর হিসেবেও একই প্রেসের ঠিকানা ব্যবহৃত হয়েছে। এর মূল্য রাখা হয়েছিল ৩০ টাকা (বাংলাদেশ) ও দুই ডলার (বিদেশ)। ত্রৈমাসিক হিসেবে প্রকাশের পরিকল্পনা থাকলেও এটি পরে আর কোনো সংখ্যায় প্রকাশিত হয় নি।

এটি মূলত ইংরেজি ভাষার সাহিত্য-পত্রিকা। পরিচিতিতে লেখা হয়েছে'poems from Bangladesh’। সেই হিসেবে এটি বাংলা কবিতার অনুবাদ পত্রিকা। প্রথম সংখ্যায় কবি আবুল হাসানের দুটি কবিতা, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর প্রবন্ধ'The poetry of Shamsur Rahman' এবং আহসান হাবীবের সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। 'Poems : First wave' শিরোনামে পঞ্চাশের দশক ও পূর্ববর্তী কবি এবং 'Poems : Second wave' শিরোনামে ষাটের দশক ও পরবর্তী কবিদের কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতাও সেখানে ছিল। কবিতাটি অনুবাদ করেছিলেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। এ-ছাড়া এ-সংখ্যায় যাঁদের নাম সূচিপত্রে পাওয়া যায় তাঁরা হলেন মাসুদ মাহমুদ, সিদ্দিকুর রহমান ও মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস।

চরিত্র ও চালচলনের চালচিত্র


রুদ্র ছিলেন দ্রোহী, অভিমানী, হাস্যোজ্জ্বল এক প্রাণবন্ত যুবক। আড্ডায় তাঁর জুড়ি নেই। কবিতায় স্থির, সিদ্ধ কিন্তু বৈষয়িক বুদ্ধিতে অস্থির, ব্যর্থ। বারবার পেশা বদলিয়েছেন, কিন্তু সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গি বদলান নি। তাঁর সম্পর্কে আমাদের প্রধান কবি শামসুর রাহমান বলেছেন-

এই তরুণ কবির মধ্যে এক ধরনের বাউ-ুলেপনা ছিল, যা তাঁকে সুস্থির হতে দেয় নি, নিজেকে পুড়িয়েছেন আতশবাজির মতো। যারা এই দৃশ্য দেখে তাদের কাছে সেটা মনোহর, চিত্তাকর্ষক মনে হয় কিন্তু যে পোড়ে তাঁর পক্ষে এই জ্বলতে থাকা অত্যন্ত যন্ত্রণাময়।২৯

রুদ্র ছিলেন প্রচ- মিশুক প্রকৃতির। অল্পসময়েই আপন করে নিতে পারতেন বড়-ছোট, পরিচিত-অপরিচিত কিংবা খ্যাতিমান ও খ্যাতিহীনকে। ষাটের অন্যতম প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেন-

রুদ্রের অহেতুক কিছু কাজকর্মে আমি ওর উপর রাগ হতাম এবং না-করার জন্য বলতাম। তবে বয়সে তরুণ হলেও আমার একান্ত বন্ধু ছিল। অসীম সাহার ছাপাখানায় রুদ্রের আড্ডায় আমিও অংশ নিতাম। আমার ভালো লাগছে ওর জীবদ্দশায়Ñ মুহম্মদ নূরুল হুদা ও রুদ্রকে আমার সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্যখানি উৎসর্গ করেছিলাম।৩০

ষাটের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি মহাদেব সাহা রুদ্র-সম্পর্কে লিখেছেন-

মৃত্যুর পর রুদ্রকে আমি দেখি নি। আমি ছিলাম ঢাকার বাইরে। জীবিত রুদ্রের হাস্যোজ্জ্বল মুখই আমার কাছে তার শেষস্মৃতি। রুদ্র সবসময়ই ছিলো অসম্ভব রকম জীবন্ত ও সক্রিয়। নানা আগ্রহ ও কৌতূহল আকর্ষণ করতো তাকে। তার মধ্যে হয়তো কিছু কিছু অবান্তর ও অপ্রয়োজনীয় আগ্রহও ছিলো। এই সব আগ্রহ, কৌতূহল ও উদ্যমের মাত্রা কিছুটা প্রশমিত হলে তার কাব্যজীবনই সম্ভবত লাভবান হতো। কিন্তু তবুও সে প্রশ্ন এখন অবান্তর। কেননা একজন মানুষের স্বভাব বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য একেক রকম, কবিরতো কথাই নেই, এই ভিন্নতা তার জন্যে আরো বেশি সত্য। বাইরের একধরনের উদ্যমশীলতা, আয়োজন-মগ্নতা ও হুল্লোড়-প্রিয়তার মধ্যেও তার নির্জন অসুখী জীবন তার প্রতি আগ্রহী কোনো মানুষেরই সম্ভবত চোখ এড়ায় নি। এড়ানোর কথা নয়, যদিও এই আত্মদহনের নিদারুণ যন্ত্রণা সে খুবই সাবধানে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতো। ব্যক্তিগত কথা সে জানাতো না সত্য, কিন্তু তার জীবনাচরণের মধ্যে তা অনেকটাই উন্মোচিতও হয়ে পড়তো। সে যে কষ্ট পাচ্ছিলো তা না-বললেও প্রায় কারো কাছেই খুব অগোচরও ছিলো না। আমাদের জীবনাচরণের একটি ভাষা আছে, সেই নিঃশব্দ অনুচ্চারিত ভাষাও অনেক কিছুই বলে দেয়। রুদ্র তার দেহ ও হৃদয়ে পীড়িত থেকেও আত্মার উদ্দেশ্যকে ম্লান হতে দেয় নি। এই কাজটি করেছিলো সে প্রকৃত কবির মতো। সেজন্যেই এই রোগ ও অসুস্থতা, দুঃখ ও হতাশার মধ্যেও সে ক্রমাগত বেড়ে উঠেছিলো, আরো কবি হয়ে উঠছিলো।৩১

রুদ্র তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো পার করেছেন কবি অসীম সাহার আড্ডায় বসে। বলা যায় অসীম সাহার আড্ডাই ছিল তাঁর সে-সময়ের বাঁচার অবলম্বন। অসীম সাহার সঙ্গে তাঁর গভীর ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়েছিল। রুদ্র সম্পর্কে কবি অসীম সাহার উপলব্ধি-

ব্যক্তিগত জীবনে রুদ্র ছিলেন একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমার সামান্য ছাপাখানায় প্রায়ই কবি যেতেন এবং আড্ডা বসাতেন। কবির অস্থির এবং হতাশাগ্রস্ত মন সবসময় আমাকে দংশন করতো। সবসময়ই কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল মনে। অনেক ছোটখাট ঘটনায় কবি অনেকের কাছ থেকে আঘাত পেয়ে একা একা থাকতে ভালোবাসতেন।৩২

কবি-সাংবাদিক জাফর ওয়াজেদ রুদ্রের সহপাঠী, রুদ্রের জীবনের অনেক আনন্দ-বেদনার সঙ্গী। এক লিখিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন-

ভিন্ন আদলে গড়া এক অনিরুদ্ধ মানুষ ছিল। যেন তার সব কিছুতেই এক স্বতন্ত্র আবহ, বৈশিষ্ট্যটুকুও নিজস্ব। মোহমুগ্ধ আকর্ষণে অনায়াসে টেনে নিতো যে-কোনো জনকেই। তারুণ্যের অসম সাহস, অন্তহীন ভালোবাসা গ্রহণের দক্ষতা আর হৃদয় উজাড় করে বিলিয়ে দেবার পাশাপাশি নানা গুণের মিশ্রণে সম্পন্ন মানুষের পথে চলেছিল। মাঝপথ পেরিয়ে যাওয়া হলো না আর।

দেখার আগেই লেখার সঙ্গে পরিচয়পর্বটি ৭৩ সালের। ‘পূর্বদেশ’ দৈনিকের ‘চাঁদের হাট’ কিশোর পাতা। আর সেখানেই ‘বরনী’ শিরোনামের ১২ লাইনের অন্ত্যমিলের কবিতার সঙ্গে নামটুকু টেনে নিয়েছিল। চাঁদের হাটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানটি তখন আয়োজন হয়েছিল অবজারভার-ভবনে। সেই অনুষ্ঠানে পাঠ করা ঐ কবিতাটি, আর গ্রুপছবিতে ও ধরা পড়েছিল। ’৭৪ সালের গোড়ায় সেই নামটুকু আবার পেলাম ঢাকা কলেজে ইন্টারমেডিয়েটে ভর্তি হবার সময়। সেবার ভর্তি পরীক্ষা হয় নি। এসএসসিতে পাওয়া নম্বরের ভিত্তিতে নোটিস বোর্ডে টাঙানো তালিকায় মানবিক বিভাগে প্রথম নামটিই ছিল রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে বেশ কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিল। তাই মানবিক বিভাগের তালিকার শীর্ষে ছিলো তার নাম। কলেজের প্রথমদিনের ক্লাশেই শ্মশ্রুম-িত তার সাথে পরিচয়। তারপর কত ঋতু, কত বছর, মাস, দিন-রজনী পেরিয়ে গেছে, সূর্য-রৌদ্রে নিজেদের ভিজিয়ে হেঁটেছি পথ।

জীবনযাপনের সব প্রসঙ্গটুকু এড়িয়ে যাবার প্রবণতা ছিল না। বাইরে যতটা এলোমেলো ভেতরে তত গোছানোÑ এমনটাই ছিল। তবু তার অস্থিরতার পায়রাগুলো ছটফট করতো। সৃজনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশকে ডেকে নিত কত অবলীলায়। সংকীর্ণতা তাকে ছোঁয় নি কখনো, পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পথে শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে যাবার সাধনায় ছেদ পড়ে নি।

জাগতিক বিষয়ের মধ্যে থেকেই লেখালেখির নিরন্তর সাধনা তার ছিল অপরিসীম। মধ্যরাতে জেগে উঠে কাগজ-কলম নিয়ে বসে যাওয়া, বারবার উচ্চারণে ছন্দের গতিপথ নির্ধারণ করা, শব্দকে নেড়ে-চেড়ে, ঝাঁকিয়ে, কত না ভেঙেচুরে বসিয়েছে ছন্দের নিজস্ব নিয়মে। চিন্তার পরিধি তার ছড়াতো সুন্দর আবহে। নতুন সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যান্দোলনে নিজেকে নিবেদিত করে পরিবর্তনের ধারা নির্মাণের ব্যাকুলতারও কমতি ছিল না।

নষ্ট সময় আর নষ্ট প্রজন্মের ভিড়ে সুদিনের সুবাতাস বইয়ে দেবার জন্য প্রান্ত থেকে প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছে। সৃষ্টিশীলতার ভেতরে সঁপে দেয়া এক জীবন বহন করে গেছে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।

অভিমানের বিশাল আকাশটুকু দেখা যেত মাঝে মাঝেই। মানুষের কাছে মানুষের কথা, জীবনের কাছে জীবনের কথা পৌঁছে দেবার শ্রমে অভূতপূর্ব আলোড়ন তুলেছিল।

আমার সময়ের বিশাল হৃদয়ের সহিষ্ণু তুখোড় তরুণ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। আলো-আঁধারের পথ থেকে কুড়িয়ে নিয়েছিল জীবনের সারাৎসার। সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে নষ্ট স্বদেশে সৃষ্ট মানুষের বিপরীতে সটান দাঁড়িয়ে মুখোশ উন্মোচনে খামতি ছিল না। সমকালের মানুষের কাছে স্বতন্ত্র ও স্বকীয়তায় অনন্য রুদ্র। সব কিছু ছাপিয়ে উপচে পড়েছিল তার কবিতার পঙক্তিগুলো।৩৩

রুদ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছে রুদ্র ছিলেন এক অজাতশত্রু মানুষ। অত্যন্ত সরল, কিন্তু প্রতিবাদী, সাহসী। তাঁর বন্ধু রেজা সেলিমের দৃষ্টিতে-

ঢাকার বাইরে ছিল রুদ্রের আর একটি জগৎ। আমার সুযোগ ঘটেছিল বাংলাদেশের অনেক জেলা ও তৎকালীন মহকুমা শহরে অনুষ্ঠিত সাহিত্য বা কবিতা-সম্মেলনে যোগ দেবার। আমরা দেখতাম সে-সব অনুষ্ঠানে রুদ্র একটি বড় আকর্ষণ। ওর অকপট সারল্য, সাহস, ব্যক্তিত্ব, কবিত্ব এবং আর একটি প্রধান গুণ কবিতাকে আবৃত্তি করাÑ সব কিছুরই সম্মিলিত আকর্ষণ ক্ষমতা ছিল। আমার বিশ্বাস এই সবগুলো মিলে-মিশে ব্যক্তি রুদ্রকেও জনপ্রিয় করে তুলেছিল।৩৪

তাঁর কবি-বন্ধু কামাল চৌধুরীর দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে রুদ্রের ভিন্ন চরিত্র। রুদ্রের কবি-জীবনের ভেতরের ব্যক্তিজীবনকেও কামাল চৌধুরী চিনতেন। রুদ্র-সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি-

রুদ্র স্বভাবে অমিতচারী ছিলো। সে ছিলো বেপরোয়া। তার চালচলন, আচার-আচরণ ছিলো আমাদের চেয়ে স্বতন্ত্র। শোকসভায় কবি রফিক আজাদ তাকে মাইকেল ঘরানার উত্তরসূরী বলেছিলেন। যথার্থ অর্থে রুদ্র ছিলো তাই। প্রতি সন্ধ্যায় হাটখোলার নন্দের দোকানে হাজিরা না-দিলে তার চলতো না। আমরা অনেকেই অনিয়মিতভাবে সেখানে গিয়েছি তবে রুদ্রের সাথে তাল মিলিয়ে ওঠা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। জলীয় ব্যাপারটি তার নিত্যদিনের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছিলো। এজন্য কোনো নিষেধ, অনুরোধ শুনতে সে রাজি ছিলো না।

বাইরে এই বেপরোয়া বেহিসেবি জীবন, অথচ ভেতরে ভেতরে রুদ্র ছিলো আশ্চর্য রকম সুশৃঙ্খল। কবিতার কাগজ-কলম থেকে শুরু করে পরিধেয় বস্ত্র কোনোকিছুই এলোমেলোভাবে রাখতো না। হাত-মুখ ধুয়ে শান্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে প্রতিদিনকার ঘটনা লিখে জানাতো প্রেমিকাকে। জীবনের সব সত্য প্রকাশযোগ্য নয়Ñ একথা মানতে রাজি ছিলো না রুদ্র। বলতো যে তাকে ভালোবাসবে সে যেন জেনেশুনেই ভালোবাসে। আসলে তার হৃদয় ছিলো বিশাল এক সারল্যে ভরা। প্রয়োজনে অনেকের সে বিরোধিতা করেছে তবে কখনো ষড়যন্ত্র করে নি। কাব্যহিংসা তার ছিলোÑ তবে পরশ্রীকাতরতা ছিলো না কখনো।৩৫

তাঁর আরেক বন্ধু-কবি আলমগীর রেজা চৌধুরীর মূল্যায়ন-

রুদ্রের মধ্যে কিছুটা বেপরোয়া ভাব ছিলো। দ্রোহী স্বভাব, কী চলনে, কী বলনে! কবিতায় শেকড়সন্ধানী আত্মমগ্নতা আমাকে প্রথম থেকে আকর্ষণ করেছিলো। পাঁচফুট সাড়ে চার ইঞ্চি লম্বা, মাথায় ঝাঁকড়া চুলের অধিকারী, মুখে গোঁফ, পোশাকে রঙ-চকচকে পাঞ্জাবি, আর জিন্সের প্যান্ট। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিলো ওর অসাধারণ দুটো চোখ। সত্যি কসম করে বলি, আমি ওকে হিংসে করতাম। রুদ্রকে বল্লে ও হাসতো। সবকিছুর মধ্যে বাউলাপনা ছিলো। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে যখন টিএসসি মোড় থেকে বাংলা একাডেমির দিকে হেঁটে যেত তখন মনে হত নগর-বাউল। ঢাকা শহরে প্রত্যেক অলিগলির কোনো-না-কোনো মুদির দোকানদারের সঙ্গে ওর জানাশোনা ছিলো। প্রচুর সিগারেট খেতে পারতো। স্টার ছিলো ওর প্রিয় ব্রান্ড। পরবর্তীতে গোল্ডলিফ। চা খেতো প্রচুর। যে-কোনো জায়গায় বসে যেত চা খেতে। ফুটপাত থেকে ফাইভ স্টার। আর মদ! হ্যাঁ সম্ভবত এটাও ওর প্রিয় বিষয়ের একটি। কবিতার মতো। প্রিয় নারী লীমার মতো। রাজনীতির মতো।

সত্যি রাজনীতি ওর প্রিয় বিষয় ছিলোÑ কী কবিতায়, কী জীবনযাপনে! ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য। ডাকসুতে নির্বাচন করেছিলো সাহিত্য-সম্পাদক হিসেবে। এ-প্রসঙ্গে একটি স্মৃতি মনে পড়ছে। এ-সময় আমাদের আরো দুজন বন্ধু আলী রীয়াজ এবং কামাল চৌধুরী একই পোস্টে নির্বাচন করেছে। জাফর ওয়াজেদ সদস্য পদের জন্য। ভিন্ন ভিন্ন ছাত্রসংগঠন এদেরকে মনোনয়ন দিয়েছিলো। ৩০৯ নম্বর ফজলুল হক হল আমাদের নির্বাচন প্রচারকেন্দ্র। একই পোস্টের জন্যে প্রচারের ব্যাপারে আমার ভূমিকা সমান। শুধু নির্বাচনের দিন আমি ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ পালিয়ে গিয়েছিলাম। আলী রীয়াজ ডাকসুতে সাহিত্য-সম্পাদক নির্বাচিত হয়। আমার এ-হেন ব্যবহারের জন্যে রুদ্র সামান্যতম ক্ষুব্ধ হয় নি। শুধু স্মিত হেসে বল্লÑ আগামী দিনগুলোতে সংগ্রাম করবি কীভাবে? সত্যিকার অর্থে আমি কাউকে দুঃখ দিতে চাই নি। আমাদের সম্পর্কের সুতো ততদিন অত্যন্ত শক্তভাবে গ্রন্থিত হয়ে গিয়েছে।৩৬

প্রকৃত বিচারে রুদ্রের কোনো শত্রু ছিল না। যারা তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করতো রুদ্র তাদেরকেও বুকে টেনে নেয়ার বিশাল হৃদয় তৈরি করেছিলেন। অনেক ঘনিষ্ঠজনের নিকট থেকে আঘাত পেয়ে কেঁদেছেন, অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, আবার তারা এলে কিংবা দেখা হলে সেই রুদ্রই একগাল হাসি দিয়ে বুকে টেনে নিয়েছেন। তাঁর এসব প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে বন্ধু-কথাসাহিত্যিক ইসহাক খান জানানÑ এলোমেলো এই অশান্ত তরুণকে অনেকেই ভুল বুঝেছে। আসল সত্যটি তারা খোঁজে নি। আমি আসল সত্যটি লিখব। রুদ্রের শত্রুরা কীভাবে তাকে আঘাত করেছে। সেই অভিমানে সারারাত কেঁদেছে রুদ্র। তারপরও বিশাল হৃদয়ের এই সিংহপুরুষ তার শত্রুদের সঙ্গে হেসে কথা বলেছে। আবার বুকে টেনে নিয়েছে। কখনও-কখনও আমি অভিযোগ করে বলতাম, ‘তুই আসলে বন্ধু চিনতে ভুল করিস’। হেসে বলতো, ‘বন্ধু আমি ঠিকই চিনি। ওদের সঙ্গে মিশি, কারণ ওরা আমার বিরোধিতা করলেও শেষপর্যন্ত আমার কাছেই ফিরে আসতে হয়। সেক্ষেত্রে পরাজয় কার? আমার? না ওদের?’

হ্যাঁ, রুদ্র মিথ্যে বলে নি। ওরাই বারবার হেরে গিয়ে ফিরে ফিরে এসেছে। সর্বকালের জন্যে রুদ্র অপরাজিত।৩৭

সব কিছু ছাপিয়ে রুদ্রের যে-রূপটি বেশি প্রতিভাত, তা হল তাঁর রুদ্ররূপ, প্রতিবাদী রুদ্ররূপ। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংস্কৃতিকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠন করেন। আবার এশীয় কবিতা উৎসবের প্রতিবাদে আয়োজন করেন জাতীয় কবিতা উৎসবের। কিন্তু সংগঠন যখন ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখছে, অনেকে ফায়দা লোটার জন্যে সংগঠনে আসছে, রুদ্র তখন সরে দাঁড়িয়েছেন। এ-সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে তিনি শুধু দিয়েছেন, বিনিময়ে কিছু নেন নি। তাঁর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন বলেন, রুদ্রের জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনে যেমন মূল ভূমিকা ছিল, সেটি যখন অস্তিত্ব অটুট প্রতিষ্ঠা পেল, তখন সে নেই। আবার পরিষদের অস্তিত্ব যখন একটু নড়বড়ে হয়ে দেখা দিলো রুদ্র এসে হাজির, আবার যখন পরিষদটি বেশ দৃঢ়পায়ে দাঁড়াবার সিদ্ধান্ত নিল, তখন সে নেই। রুদ্র যেন ত্রাণকর্তার মতো প্রয়োজনে আসতো আর যেত। জানি না অন্য ব্যাপারে তার কী ভূমিকা থাকত, তবে জাতীয় কবিতা পরিষদের বেলায় তার ভূমিকা এমনিভাবেই পালিত হয়েছে। মননে ও চিন্তায় রুদ্র দেশদরদী ছিল। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল ওর চিন্তা-চেতনা। কবিতার বেলায়ও তার দৈশিক ঐতিহ্য এবং আবহমান বাংলার আদিরূপের উপাসনা, মগ্নতা ও সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া যেত। এসব কারণে তার কবিতা এত লোকপ্রিয় ছিল। আমরা যারা ওর চেয়ে বয়সে বড় ছিলাম, তাদের প্রতি সে সবসময় শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখাত। মনে মনে দ্রোহী আবার বাইরে ভদ্র ও বন্ধুপ্রিয়। ব্যক্তিগত মনোকষ্টে খুব ব্যথিত হয়েছে কিন্তু বাইরে তত প্রকাশ না পেলেও তার কবিতার মধ্য দিয়ে সেটি প্রকাশিত হয়েছে। তার কষ্ট কবিতার লাইনে ফুটে উঠেছে। এসব জাতকবির লক্ষণ। কিন্তু সব কিছুকে ছাড়িয়ে দেশের জন্যে বোধ, কষ্ট-সুখ, আনন্দ-বেদনা, ভালোবাসা সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তার কবিতার মাধ্যমে। মানবপ্রেমিক যেমন ছিল তেমনি দেশপ্রেমী।৩৮

হ্যাঁ, রুদ্র ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। তাই দেশের স্বাধীনতাকে বিপন্ন হতে দেখে, কিংবা পরাজিত শত্রুর উত্থান দেখে তিনি শংকিত।

দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন। নিজের হাতে গড়া সংগঠনে যখন তিনি স্বৈরাচারী পরিবেশ লক্ষ্য করেন, সেখানেও জ্বলে ওঠে তাঁর প্রতিবাদী রুদ্ররূপ। তাঁর বন্ধু-কবি তুষার দাশের ভাষায়-

Rudra was a friend. But as a person he was on a higher plain because he had all the courage which we never had. From the stage of Jatiya Kabita Parishad he spoke out in the face of numerous adversaries; 'I am reading out my poems in defiance of the autocratic government and all the autocracies inside this very Kabita Parishad.' It was not possible for us to protest as he did. There, Rudra was the most courageous sould of our brave time. To call him a friend is a source of pride. He possessed a natural simplicity. We came to the city at a much later age and yet we were consumed by an urban crookedness, inferiority complex, deception and shyness. But nothing could destroy his simplicity. His simle reflected his simple personality and was familar to all acquaintances.39

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ছিলেন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী কবি। ভ-ামিকে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। আপোসকামিতাকে ঘৃণা করতেন। নিজের শরীর-স্বাস্থ্যের প্রতি বেখেয়ালি ছিলেনÑ এই তাঁর বড় দোষ। আর কবি হিসেবে ছিলেন একটু বেশি আবেগপ্রবণ। তাঁর ব্যক্তিচরিত্র এবং কবিচরিত্র সম্পর্কে কবি ফেরদৌস নাহার বলেছেন-

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বড় মাপের একজন মানুষ ছিলেন। কবি হিসেবে তাঁর কোনো ক্ষুদ্রতা ছিল না। একটু সেন্টিমেন্টাল ছিলেন। তবে তাঁর যাপিত কবি-জীবনকে অনেকটা ইচ্ছাকৃত বলে মনে হয়। কবিতা নিয়ে তাঁর জবমঁষধৎ চৎধপঃরপব ছিল। তাঁর সময়ে তিনি বড় মাপের এবং উল্লেখযোগ্য কবি ছিলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর প্রেমের কবিতাগুলি অসাধারণ। তাঁর সরাসরি প্রতিবাদের ভঙ্গিটিও আমার ভালো লাগে।৪০

জীবনের গোধূলিবেলায়


রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ জীবন-যাপনে সুনিয়ন্ত্রিত ছিলেন না। শরীরের প্রতি যথেষ্ট অত্যাচার করতেন স্বেচ্ছায়। একমাত্র কবিতা ছাড়া সব কিছুর প্রতিই তাঁর প্রবল ক্ষোভ। নিজের স্বাস্থ্যরক্ষার প্রতি তিনি মোটেই মনোযোগী ছিলেন না। মদ্যপানের নিয়মিত অভ্যাস ছিল। সিগারেটের প্রতি আসক্তি ছিল প্রবল। খাবারদাবারেও অনিয়ম করতেন। রুদ্রের পাকস্থলিতে আলসার হয়েছিল। পায়ের আঙুলে হয়েছিল বার্জার্স ডিজিজ। কিন্তু চিকিৎসার জন্যে কোনো উদ্যোগ নেন নি। তাঁর অসুখ সম্পর্কে চিকিৎসক-স্ত্রী তসলিমা নাসরিন জানিয়েছেন-

রুদ্রের পায়ের আঙুলে একবার বার্জার্স ডিজিজ হয়েছিল। ডাক্তার বলেছিলেন, পা-টাকে বাঁচাতে হলে সিগারেট ছাড়তে হবে। পা এবং সিগারেটের যে-কোনো একটাকে বেছে নিতে বলেছিলেন। রুদ্র সিগারেট বেছে নিয়েছিল। জীবন নিয়ে রুদ্র যতই হেলাফেলা করুক, কবিতা নিয়ে করে নি, কবিতায় সে সুস্থ ছিল, নিষ্ঠ ছিল, স্বপ্নময় ছিল। পাকস্থলিতে ক্ষত নিয়েও সে খাওয়ায় অনিয়ম করত। কোনো অসুখই রুদ্রকে বশে রাখতে পারে নি। রুদ্র উঠেছে, ঘুরেছে, নেশায় মেতেছে। এই বয়সে রক্তচাপ সাধারণত বাড়ে না, রুদ্রের বেড়েছে, তবু সবচেয়ে বিস্ময় এই যে, কোনো রোগই রুদ্রকে রুগ্ন করে নি, রুদ্র সকল অসুস্থতা আড়াল করে অমলিন হেসেছে।৪১

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ মৃত্যুর কিছুদিন আগে ‘কাব্যসমগ্র’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অনেক প্রকাশকের সঙ্গে আলোচনাও করেছিলেন, কিন্তু কেউ সাড়া দেন নি। ‘নির্বাচিত কবিতা’ কিংবা ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’-র সংকলন প্রকাশের আগে ‘কাব্যসমগ্র’ প্রকাশের উদ্যোগ কেন? তাহলে কি রুদ্র টের পেয়েছিলেন যে তাঁর সময় ঘনিয়ে এসেছে!

শেষদিকে রুদ্র গান রচনার দিকে ঝুঁকেছিলেন। নিজের গানে নিজেই সুর দিতেন। সিনেমা বানানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন। ১৯৯১ সালের বইমেলা শেষ হওয়ার দিনকয়েক আগে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে এক দুপুরে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সঙ্গে বর্তমান লেখকের দেখা হয় নীলক্ষেতের মোড়ে। তিনি মতিঝিলের দিকে যাওয়ার জন্যে রিকসা খুঁজছিলেন। আমি তাঁর কাছে জানতে চাইছিলাম নতুন কোনো বই বের হচ্ছে কিনা। তিনি বলেন, ‘এবারে কোনো আলাদা বই বেরুচ্ছে না। সমগ্র বেরুলে বেরোতে পারে। তবে খুটিনাটি খুনশুটি সিরিজের কবিতাগুলো লেখা হলে আগামী বছর এই নামে বই করব।’ কথাপ্রসঙ্গে রুদ্র এক অভিনব পরিকল্পনার কথা জানান, “জন্মসূত্রে মানুষ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের পরিচয় বহন করবে, আমি তা মানি না। তাই ভাবছি ‘ইসলাম ধর্ম’ ত্যাগ করে ‘মানবধর্মে’ দীক্ষা নেব এবং এ-ব্যাপারে উকিলের সঙ্গে আলাপ করছি।” এরপর আর তাঁর সঙ্গে এই লেখকের দেখা হয় নি। শুনেছি তাঁর এই বিপ্লবী পরিকল্পনার কথা আরো অনেকের কাছে জানিয়েছেন।

সার্বক্ষণিক অসুস্থতা নিয়েও রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা পড়তে যেতেন। এ-সময়ের ভ্রমণ, অসুস্থতা এবং তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে পুনর্গঠিত অন্তরঙ্গতা সম্পর্কে বিশিষ্ট কথাশিল্পী রশীদ হায়দার জানিয়েছেন-

রুদ্রের সঙ্গে আমার সবচেয়ে আনন্দময় স্মৃতি ঝিকরগাছা ও পাবনায়। গত ডিসেম্বরে আমরা ঝিকরগাছার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ ফোরামে গিয়েছিলাম। আসাদ চৌধুরী, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, তসলিমা নাসরিন ও আমি গেলাম ঢাকা থেকে, যশোর থেকে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলো সমুদ্র গুপ্ত ও জাহিদ হায়দার। তখন সদ্য এরশাদের পতন হয়েছে। গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আবহাওয়াই অন্যরকম। রুদ্র ঝিকরগাছার ও-রকম শীতে রাত এগারোটা-বারোটায়ও অনুষ্ঠানে হাজার হাজার লোকের উপস্থিতি দেখে আনন্দ-উত্তেজনায় যেন ফেটে পড়ছিলো। ওকে যারা জানে, তারাই বোঝে তার সে মনোভাব প্রকাশের বাড়াবাড়ি নেই; ‘ঢাকার কবি’ বলে কোনো বাহাদুরি নেই, নিজেকে জাহির করার কোনো প্রবণতা নেই। রুদ্র যে রাজধানীর নয়, বাংলাদেশে বৃহত্তর খুলনা জেলার মফঃস্বল এলাকারই মানুষ; মাটি ও মানুষের সঙ্গেই তার নিত্য ওঠানামা সেটা ওর কথা ও আচরণে ছিলো স্পষ্ট। নিঃসন্দেহে এ-জন্যেই ওর হাত দিয়ে ‘মানুষের মানচিত্র’ বেরিয়েছে একের পর এক। নাগরিক জীবন ওর জীবন থেকে মাটি ও মানুষকে কেড়ে নেয় নি। ঝিকরগাছায় গিয়ে ওর স্বরূপটা মনে হয় আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম।

ঢাকায় ফেরার সময় কামারখালি ঘাটে ফেরির কারণে পাকশী-পাবনা হয়ে আমাদের ঢাকায় ফিরতে হয়। পাবনা শহরের উপকণ্ঠে আমাদের পৈতৃক বাড়ি। সন্ধ্যার পরে বাড়ি গিয়ে ভাত খেয়ে রাত নয়টার দিকে ঢাকায় রওনা দিলাম। সঙ্গে আসাদ চৌধুরী ছিলেন না। সমুদ্র গল্পের রাজা, রুদ্রও কম যায় না, সারা রাস্তা মাতিয়ে রেখেছিলো, পথের ক্লান্তি বুঝতে দেয় নি। আমাদের বাড়িতেই ওকে দেখেছিলাম ভিন্ন চেহারায়। ওর ডানহাতের একটি আঙুলে ঘা হয়েছিলো বলে তসলিমা ওকে মুখে খাবার তুলে দিচ্ছিলো। অসহায় শিশুর মতো খাচ্ছিলো রুদ্র। এই খাওয়া নিয়ে সমুদ্র, জাহিদ ও আমি গাড়িতে ক্ষেপিয়েছি ওকে। ও মজা পেয়েছে।৪২

শেষদিকে অর্থাৎ ১৯৯০ সালের শেষ দিকে তসলিমা নাসরিন ও রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সঙ্গে মেলামেশা বৃদ্ধি পায়। রুদ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইসহাক খান, যিনি রুদ্রের সারা জীবনের অন্যতম সঙ্গী, তাঁর একটি লেখায় রুদ্রের শেষজীবন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়-

গোটা নব্বই সাল রুদ্র ছিল সর্বত্র বিরাজমান। কবিতায়, গানে, মঞ্চে, আবৃত্তিতেÑ এককথায় সবখানে তার সরব উপস্থিতি। সবই চলছিল আগের মতো। কাজ, আড্ডা, হৈচৈ সবই।

এর মধ্যে হঠাৎ করেই আবার ছন্দপতন ঘটল কাব্যের। রুদ্রের সাবেক স্ত্রী বড় আনাগোনা শুরু করল আবার। নব্বইয়ে বিজয় দিবসের এক অনুষ্ঠানে আমি আর রুদ্র মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, হঠাৎ দেখলাম ভিড় ঠেলে রুদ্রের সাবেক স্ত্রী আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে এসে রুদ্রকে বলল, ‘চলো, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।’ রুদ্র আপত্তি তুলে বলল, ‘এখন যেতে পারব না। আমি অনুষ্ঠান শুনব।’ কিন্তু ওর সাবেক স্ত্রী কোনো কথাই শুনছিল না। একরকম জোর করেই নিয়ে গেল রুদ্রকে। রুদ্র আমাকে বলল, ‘তুই থাকিস কিন্তু। আমি এক্ষুনি এসে পড়ব।’

রুদ্র কিন্তু এক্ষুনি আর আসতে পারে নি। সে-রাতে আমাদের কথা ছিল স্বৈরাচারমুক্ত বিজয় দিবসের উৎসবে আমরা দূরে কোথাও হারিয়ে যাব। অথচ আমার বাউলবন্ধুটির সঙ্গে দেখা হল একসপ্তাহ পর।

বললাম, কিরে কোথায় ডুবে ছিলি?
বলল, ওর (সাবেক স্ত্রী) সঙ্গে ছিলাম।
আমি বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম, পুরো সাতদিনই ওর সঙ্গে কাটালি?
সহজ গলায় বলল, হ্যাঁ, কাটালাম।
-বাসায় আর কেউ ছিল না?
-ওর মা ছিল।
-ওর স্বামী?
বলল, ওর স্বামীর খবর আমি জানি না।

তারপর ক্রমাগত দুজনকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে দেখা গেল। বন্ধুরা অনেকেই আবার সংশয় প্রকাশ করতে লাগল। অনেকেই আমাকে বিষয়টি নিয়ে বিরক্ত করেছে। বলেছে, ‘ওরা কি আবার বিয়ে করছে নাকি?’ আমি সোজা বলেছি, ‘আমি কিছু জানি না।’

একদিন কবি অসীম সাহার ইত্যাদি প্রেসে বসে আড্ডা দিচ্ছি। আমরা সাত/আটজন সেখানে বসে আছি, রুদ্রও ছিল। হঠাৎ ওর সাবেক স্ত্রী এসে হাজির। এসেই সে রুদ্রকে কোথাও যেতে বলল। রুদ্র যেতে অরাজি। তখনি ওর সাবেক স্ত্রী নাটুকে কায়দায় সবার উদ্দেশে বলল, ‘আপনাদের কবিকে আমি নিয়ে যাচ্ছি, যথাসময়ে ফিরিয়ে দিয়ে যাব।’ বলেই হাত ধরে টানতে লাগল এবং শেষপর্যন্ত নিয়েই গেল রুদ্রকে।

বিষয়টি আমার ভালো লাগছিল না। রুদ্রকে একদিন বললাম, ‘কিরে, আবার কী ফাউল খেলা শুরু করলি?’ হেসে বলল, ‘অবজারভ করলাম। ভয়ের কোনো কারণ নেই দোস্ত। নেড়ে বেলতলায় একবারই যায়।’
‘আমিতো ভাবলাম, তোরা আবার বিয়ে করছিস। বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনে এরকম ঘটে তো। রিচার্ড বার্টন আর এলিজাবেথ টেলর দ্বিতীয়বার বিয়ে করে সাড়া জাগিয়েছিল। তোরাও করে ফেল।’
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল, ‘জিনিস আগের মতোই আছে। কোনো উন্নতি হয় নি। ঘর করা সম্ভব নয়।’
কথাটা রুদ্র যেভাবেই বলুক আমি কিন্তু নতুন করে তার মধ্যে অস্থিরতা লক্ষ্য করি। আবার সে বেহিসেবি হয়ে ওঠে।
সেই সময় বইমেলা চলছিল বাংলা একাডেমিতে। এক সন্ধ্যায় ওকে খুশি খুশি দেখাচ্ছিল। হেসে বললাম, ‘কিরে, মেজাজে বড় রোশনাই, কেসটা কী?’ মুচকি হেসে চোখ ইশারা করল দূরে। দেখলাম একটি শ্যামলা মেয়ে খাবারের স্টলে খাবার পরিবেশন করছে। বলল, ‘প্রেমে পড়েছি দোস্ত’। আমি ঠাট্টার সুরে বললাম, ‘প্রেম কি একতরফা?’

হাসতে হাসতে বলল, ‘কৃষ্ণ দিয়েছে ডাক, রাধা কি মুখ ফেরাতে পারে!’
শুরু হল রুদ্রের আর-এক অধ্যায়। ততোদিনে রুদ্রের সাবেক স্ত্রী তৃতীয় বিয়ের আয়োজন শেষ করে ফেলেছে। সেই সময় রুদ্র নতুন প্রেম নিয়ে মশগুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই শ্যামলা মেয়েটির সঙ্গে আমাদেরও বহুদিন আড্ডা হয়েছে। কথা হয়েছে। রুদ্রের পরিবারের সদস্যরাও ব্যাপারটি জানত। আমি অনেকদিন বাসায় গিয়েও ওদের একসঙ্গে আবিষ্কার করেছি। সর্বশেষ রোজার ঈদের তিনদিন আগে আমরা একসঙ্গে রুদ্রের রান্না করা খিচুড়ি খেয়েছি। কথা ছিল মেয়েটি তার গোপালগঞ্জের বাড়িতে ঈদের ছুটি কাটাতে যাবে। পিতামাতাকে সে বিয়ের কথা জানাবে। ফিরে এসে তারা বিয়ে করবে। দিন ঠিক হয়েছিল। ২৪ এপ্রিল। তাদের প্রথম আলাপ হয়েছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি। এই জন্যে ২৪ তারিখটা তারা বিয়ে করবে বলে বেছে নিয়েছিল।

যথাসময়ে মেয়েটি ঢাকা ফিরে এসেছিল। কিন্তু রুদ্রের সঙ্গে সে আর যোগাযোগ করে নি।
আমি রুদ্রকে ঘটনার পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় বড় হতাশ কণ্ঠে ও বলেছিল, ‘হল না দোস্ত, খবর নেগেটিভ।’ আমি হতভম্ব মুখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার কষ্ট বাড়তে থাকে। কী অন্যায় করেছিল এই যুবকটি, যাকে শুধু ধূপের মতো জ্বলতে হচ্ছে? ঘটনাটি খুব ছোট। খুবই স্বল্প সময়ের ঘটনা। কিন্তু ঘটনাটি রুদ্রের জীবনে দারুণ প্রভাব ফেলে। সত্যি-সত্যি এই মেয়েটিকে নিয়ে রুদ্র আবার স্বপ্ন তৈরি করেছিল। নিজেকেও প্রস্তুত করছিল সেইভাবে। একদিন বাসায় গিয়ে দেখি রান্নাঘর গোছাচ্ছে। বললাম, ‘কিরে, তুই আবার কী শুরু করেছিস?’ হেসে বলল, ‘ঘর বাঁধছি দোস্ত। নতুন মানুষ আসবে। তাই তার আসার পথ প্রশস্ত করছি।’ অথচ মেয়েটি এল না। এই ছোট্ট ঘটনাটি তার ক্ষতে আবার নতুন করে হেমলক ঢেলে দেয়। আবারও অন্য মানুষ হয়ে যায় সে। বাইরে সে ধীরস্থির থাকলেও ভেতরটা তার পুড়ে অঙ্গার হতে থাকে। এই সময়ই তার শরীরে নানারকম উপসর্গ দেখা দেয়। ভয়াবহ আলসারটি মূলত তখন থেকে।৪৩

১৯৯১-র শুরু থেকে রুদ্রের অসুস্থতার মাত্রা বাড়ে। ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কবিতা পরিষদের এক অনুষ্ঠানে অতিথি কবি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ও আনিসুল হক। আনিসুল হক ‘পূর্বাভাস’ পত্রিকায় তাঁর নির্ধারিত কলামে রুদ্রের অসুস্থতা সম্পর্কে লেখেন-

ময়মনসিংহ নেমে আমরা হাঁটতে লাগলাম। রেললাইনের পাশ দিয়ে। কিছুটা পথ হেঁটে যাবো। তারপর উঠবো রিক্সায়। পথের মাঝখানে রুদ্র হঠাৎ দাঁড়ালেন। আমাকে বলেন-

একটু দাঁড়াও। এইভাবে সামান্য পথ যেতেই দাঁড়াতে হচ্ছিলো রুদ্রকে। একনাগাড়ে বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেন না তিনি। দাঁড়াতে হয়। একটা পা কাজ করে না তখন। আমি রুদ্রের মুখের দিকে তাকালাম। চোখে মুখে কষ্টের সামান্য চিহ্ন নেই। কী সাবলীল অভিব্যক্তি! অথচ কী কষ্টকর অসুখ বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি! খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়Ñ একটা পা একটু টেনে টেনে হাঁটছেন তিনি। কোত্থেকে পান রুদ্র এই মানসিক উদ্যম, ভেতরে বিষের বালি, অথচ মুখ বুঁজে মুক্তো ফলান তিনি। কী উজ্জ্বল তাঁর চোখজোড়া, কী হাসিমাখা মুখ!

দুপুরে গেলাম ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে। ওখানে হোটেল আছে। সেখানে বিরিয়ানি রান্না হয়। শহরের সৌখিন মধ্যবিত্ত আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা প্রায়ই খেতে আসে এখানে। ঐ হোটেলে খেতে বসলাম আমরা। রুদ্রের ডান করতলে সামান্য ক্ষত ছিলো, সেদিনই নাকি ব্যান্ডেজ খুলেছিলেন তিনি। চামচ দিয়ে খেতে লাগলেন। খাবার শেষে বেরিয়ে এসে সিগ্রেট কিনলেন। সিগ্রেটে একটা বড়ো টান দিয়ে ছাড়লেন দীর্ঘতর এক শ্বাস। বললেন, আগে প্রায়ই আসতাম ময়মনসিংহে। এই প্রেসক্লাবের এই হোটেলটিতে কতদিন দুজনে খেয়েছি। তিনি অন্য এক জগতের মধ্যে থেকে যেন বলছিলেন কথাগুলো। সে জগৎ এক সুখের এবং এক অসুখের জগৎ। শুধু দেহে নয়, রুদ্রের মনের মধ্যেও এক মোহন অসুখ বাসা বেঁধেছিলো।

সন্ধ্যায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা পাঠের আসর হলো। রুদ্র পড়লেন, দুটি কবিতা, প্রায় অনুষ্ঠানেই ইদানিং পড়তেন তিনি ঐ কবিতা দুটি, ইশতেহার এবং রাস্তার কবিতা।
রাত্রি দশটার দিকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ কবিদের সঙ্গে খাবার খুঁজতে বেরিয়ে পড়া গেলো। কিন্তু রুদ্রকে খুঁজে পাওয়া গেলো না। এরই মধ্যে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গীতিকার মিলন খানের সঙ্গে কোথায় গেছেন। হয়তো কোনো রুমে বসিয়েছেন আসর। আমরা অনেক খুঁজে একটি হোটেলে ভাতের সন্ধান পেলাম। রুদ্রকে খুঁজতে গেলেন একজন। খানিকক্ষণ পর এলেন রুদ্র। ততক্ষণে হোটেলের খাবার প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। রুদ্রের জন্যে সামান্য কিছু তরকারি আর ডাল ছিলো। ঠা-ায় জমে হিম হয়ে যাওয়া খাবার। কিন্তু কোথাও চামচ পাওয়া গেলো না। রুদ্রের হাতে অসুখ, তিনি হাত দিয়ে খেতে পারবেন না। শেষে এক বিশাল চামচ, যা দিয়ে হাড়ি থেকে ভাত তোলা হতো, রুদ্রকে দেয়া হলো। ঐটি দিয়ে রুদ্র ভাত খেলেন। খুব বেশি খেতে পারলেন না। শেষে ডালটুকু ঢেলে নিলেন গ্লাসে। একগ্লাস ডাল চুমুক দিয়ে দিয়ে খেলেন।৪৪

জীবনের শেষপর্যায়ে তিনি নিয়মিত আসতেন নীলক্ষেত-বাবুপুরায় কবি অসীম সাহার ‘ইত্যাদি’-তে। এ-সময় কবি অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। কোথাও তেমন একটা যেতেন না। এই সময়ের কথা বলতে গিয়ে তসলিমা নাসরিন উল্লেখ করেছেন-

কেউ তাকে সামান্য আশ্রয় দেয় নি। কেবল অসীম সাহা দিয়েছিল, নীলক্ষেতে তার টেবিলের বা-পাশে রুদ্রকে একটি চেয়ার দিয়েছিল বসবার জন্য। রুদ্র সকাল, দুপুর, বিকেল ঐ একটি চেয়ারে নিমগ্ন বসে জীবন পার করতো।৪৫

তবে বিকেলে অসীম সাহার প্রেসের আড্ডাটি জমে উঠতো। অসীম সাহা ও রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সঙ্গে মাঝে-মাঝে যোগ দিতেন কবি মহাদেব সাহা, কবি নির্মলেন্দু গুণ, সাহিত্যিক আহমদ ছফা, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, চিত্রকর সমর মজুমদার, সঙ্গীতশিল্পী কিরণচন্দ্র রায়, কবি কাজলেন্দু দে, সাহিত্যিক ইসহাক খান, সরকারি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান প্রমুখ। কবি তসলিমা নাসরিনও আসতেন কখনো কখনো। এই আড্ডাতেই রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ ঘটে। অসীম সাহার উদ্যোগে একটি পত্রিকা বের করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ‘পরিচয়’ নামের সেই পত্রিকার একটি সংখ্যা বেরিয়েছিল প্রস্তুতি সংখ্যা হিসেবে। এ সম্পর্কে রুদ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি রেজা সেলিম জানিয়েছেন-

রুদ্রের শেষ সময়টা কেটেছে একাকী। অসীমদা’র প্রেসে ও নিয়মিত একটি আড্ডা শেষের দিকে জমিয়ে তুলেছিল। কিছু করতেও চেয়েছিল। একটি যথার্থ কাগজ তৈরি করা নিয়ে অসীমদার সাথে যে-সব পরিকল্পনা সে গড়ে তুলেছিল তার প্রায় সবটাই আমাকে বলেছিল। আমিও উৎসাহী ছিলাম। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, ‘যে-ভাবেই হোক, আমি তোমার সাথে থাকবো।’ থাকা হয় নি। ও যে ভেতরে ভেতরে এতো ধ্বংস হয়ে গেছে, আমরা বুঝতেই পারি নি। শরীর ভালো থাকে না, এটা শুনতাম। শুনেছি পায়ের অসুখ, ভালো করে হাঁটতে পারে না। ডাক্তার সিগারেট খেতে নিষেধ করেছেন, কমিয়েও দিয়েছিল, বলেছিল একেবারে ছেড়েও দেবে।৪৬

এই আড্ডার সঙ্গী থাকতেই রুদ্র একসময় অনুপস্থিত থাকেন। অসুস্থ হয়ে রুদ্র তখন হলিফ্যামিলি হাসপাতালে। কবি অসীম সাহা-ই ঘনিষ্ঠজনদের জানান রুদ্রের অসুস্থতার কথা। হলিফ্যামিলির ২৩১ নম্বর কেবিনে অসুস্থ রুদ্রকে দেখতে যান অনেকেই।

রুদ্র যে-রোগের চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে ভর্তি হন তার নাম পেপটিক আলসার। এটি মারাত্মক কোনো রোগ নয়। সপ্তাহখানেক হাসপাতালে থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ২০ জুন রুদ্র বাসায় ফেরেন। হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার স্মৃতিচারণ করে মাসিক ‘নান্দনিক’ পত্রিকায় সাংবাদিক আবু মাসুম লেখেন-

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত তেমন কোনো পরিচয় ছিলো না। কবি হিসেবেই জানতাম ওকে। ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু রতন মাহমুদ জানালো ওর এই কঠিন অসুখ-সংবাদ।

আমি প্রথম যেদিন হলিফ্যামিলিতে ওকে দেখতে যাই, সেদিন অফিস থেকে সরাসরি গিয়েছিলাম। মধ্যদুপুরে। ২৩১ নম্বর কক্ষ খুঁজে পেতে কষ্ট হয় নি।

আমার হাতে রজনীগন্ধার ডাঁটি দেখে রুদ্রর চোখজোড়া ভীষণ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলো। দেখি, পাশে বসে আছেন আহমদ ছফা। রুদ্রর একটা হাত জড়িয়ে রেখেছেন তার হাতে। কথা বলছিল অল্প অল্প, মৃদুস্বরে। আহমদ ছফা বেরুনোর সময় রুদ্রর মাথায় হাত রেখে বললেনÑ ‘তুমি তো ভালো হয়ে গেছো। আমি আবার আসবো।’ যাওয়ার সময় আহমদ ছফা একটা ইনভেলাপ রেখে গেলেন রুদ্রর বালিশের নিচে।

আমি তখন বসলাম রুদ্রর মাথার কাছে রাখা চেয়ারে। রতন দাঁড়িয়েছিলো রুদ্রর পায়ের কাছে। খুচরো কথাবার্তা বলছিলো ওরা। পারিবারিক ঘটনার কিছু সংলাপ আমি বুঝতে পেরেছিলাম। রুদ্রর শরীরে তখনো চলছিলো স্যালাইন।

ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার আগের দিন আবার গেলাম হলিফ্যামিলিতে, রুদ্রকে দেখতে। আশ্চর্য সে উঠে বসেছে এবং বেশ ফ্রেস লাগছিলো ওকে। আমি মাসিক ‘নান্দনিক’-এর সদ্য প্রকাশিত প্রথম সংখ্যাটি বাড়িয়ে দিলাম। উল্টে-পাল্টে দেখে রুদ্র, মন্তব্য করলোÑ বাহ, চমৎকার! বিশেষ করে শিল্পী সুলতানের সাক্ষাৎকারটির কথা বারবার উল্লেখ করলো রুদ্র। তারপর প্রায় দুঘণ্টা টুকরো-টাকরা কথাবার্তা চললো আমাদের। আমি ওকে একটা ঈদকার্ড বাড়িয়ে দিলাম। কার্ডটা হাতে নিয়ে ম্লান হাসলো রুদ্র। তারপর বললো, ‘আজ ডাক্তার আমাকে সলিড কিছু খেতে দেবে।’ ওর প্রাণশক্তি যে কত দৃঢ়, বুঝতে পারলাম তখন। কারণ একটানা প্রায় তিনসপ্তাহ ওকে স্যালাইন দেয়া হয়েছে। তাছাড়া আমার সদ্যপ্রকাশিত একটি কবিতা-প্রসঙ্গে রুদ্র মন্তব্য করেছিলো, ‘কবিতার শেষ লাইনটা কেমন জানি ঝুলে গ্যাছে।’ এই অসুস্থ শরীরে ওর প্রখর কাব্যানুভূতিতে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম।৪৭

হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও রুদ্র মানসিক শক্তিতে বলীয়ান ছিলেন। হাসপাতালে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন ডাক্তার কানিজ মাওলা-র। তাঁকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতেন ডাক্তার ওহাব, ডাক্তার প্রভাকর পুরকায়স্থ এবং কবিভ্রাতা ডাক্তার মোঃ সাইফুল্লাহ। সুস্থ হয়ে রুদ্র ২০ জুন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরেন। পরের দিন ২১ জুন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃক্রিয়া সম্পন্ন করে দাঁত ব্রাশ করতে বেসিনে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ তিনি মুখ থুবড়ে বেসিনের উপর পড়ে যান। সিরামিকের বেসিন কবির ভর বইতে পারে না। ভেঙে গড়িয়ে পড়ে মেঝেয়। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। তখন সময় সাড়ে সাতটা। তাঁর ভাই ডাক্তার মুহম্মদ সাইফুল্লাহ জানান, রুদ্র তখন আক্রান্ত হয়েছিলেন ঝঁফফবহ ঈধৎফরধপ অৎৎবংঃ-এ।

মুহূর্তের মধ্যে রুদ্রের মৃত্যুসংবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের প্রতিটি কাগজে ছবিসহ এ-সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাঁর বন্ধু কবি কাজল চক্রবর্তীর সৌজন্যে এ-সংবাদ কোলকাতার পত্রপত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। এ-সময় কোলকাতায় অবস্থান করছিলেন বাংলাদেশের কবি সমরেশ দেবনাথ। তিনি জানিয়েছেন-

২২ তারিখ বিকেলে আমরা কাজল চক্রবর্তীর বাসায় কথা বলছি। এমন সময় একজন (সম্ভবত কাজলের আত্মীয়) বললেন, আপনাদের কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ মারা গেছেন। রাতে মোহন রায়হান ফোন করেছিলেন। কথাটা শুনে আমি অবশ হয়ে পড়ি। আমার ঠোঁট কাঁপতে থাকে। কাজল বাসায় ছিলো না, মাসিমার কাছে একটি চিরকুট লিখে চলে আসি। কাজল বাসায় এসেই চলে যায় আমাদের হোটেলেÑ সাথে ও একটি প্রেসবিজ্ঞপ্তি লিখে নিয়ে যায় পত্রিকায় দেয়ার জন্য। পরদিন আমরা ‘কফি হাউজে’ খবরটি পরিবেশন করলাম এবং ‘পাতিরামে’র সামনে রুদ্রের মৃত্যুসংবাদটি পোস্টার লিখে টাঙিয়ে দিলাম।৪৮

এদেশের প্রতিটি দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বিশেষ প্রতিবেদন, এ-সময় সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ পত্রিকা ‘শোক সংবাদ’ শিরোনামে লেখেÑ

সত্তর দশকের বিশিষ্ট দ্রোহী ও রোমান্টিক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ২১ জুন সকাল সাড়ে সাতটায় তার পশ্চিম রাজাবাজারস্থ বাসভবনে আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে ... রাজেউন)। তার বয়স হয়েছিল ৩৪ বছর।

তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল এই কবির মৃত্যুর খবরে রাজধানী ঢাকার লেখক, শিল্পীমহল ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। শেষদেখা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য অনেকে তাঁর বাসভবনে ছুটে যান। বাদ জুমা রুদ্রর নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে। জানাজার পর অনেকক্ষণ তাঁর লাশ টিএসসিতে রাখা হয়। আইসিডিডিআরবি’র মরচ্যুয়ারি থেকে ২২ জুন রুদ্রর লাশ দাফনের জন্য খুলনার মোংলায় নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে।

রুদ্র কতিপয় জটিল ব্যাধিতে ভুগছিলেন। হলিফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসার পর তিনি বাসায় ফিরে গিয়েছিলেন। রুদ্র, মা, বাবা, পাঁচ ভাই, চার বোন রেখে গেছেন।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশালে। তার পৈতৃক বাস বাগেরহাটের মিঠেখালি গ্রামে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্সসহ এমএ পাস করেন।
রুদ্রর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সাতটি। এর মধ্যে রয়েছে উপদ্রুত উপকূল, ফিরে চাই স্বর্নগ্রাম, মানুষের মানচিত্র, মৌলিক মুখোশ, ছোবল ইত্যাদি। রুদ্র কিছু গল্প আর গানও লিখেছেন।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ছিলেন জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা-যুগ্মসম্পাদক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রথম আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং বাংলাদেশের সঙ্গীত পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও প্রকাশনা সচিব। বিগত স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনে মরহুম রুদ্র সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংস্থা ও সংগঠন তরুণ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর অকালমৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা, সংগঠনের মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় পাঁচদল, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বাংলাদেশ লেখক শিবির, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, জাতীয় কবিতা পরিষদ ঢাকা জেলা শাখা, স্বরশ্রুতি, বাংলাদেশ ছড়া সাহিত্য পরিষদ, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, আবৃত্তি সংগঠন ক’জনা, বাংলাদেশ গীতিকবি সংসদ, অরণি-সাংস্কৃতিক সংসদ, বাংলাদেশ সঙ্গীত পরিষদ, জাতীয় কবিতা পরিষদ ঢাকা কলেজ শাখা ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (সা-সা)।৪৯

রুদ্রের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের প্রায় প্রতিটি ব্যক্তি এবং সংগঠন। ২২ জুন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর স্মরণে জাতীয় কবিতা পরিষদ জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এক শোকসভার আয়োজন করে। এই শোকসভার বিস্তৃত বিবরণ জানা যায় ‘অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক, জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই’, শীর্ষক এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটি রচনা করেন গল্পকার রিশিত খান। তিনি লিখেছেন-

জাতীয় কবিতা পরিষদ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র স্মরণে ২২ জুন এক শোকসভার আয়োজন করে। প্রেসক্লাবের এ-শোকসভায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমাবেশ ঘটে। শামসুর রাহমান-এর সভাপতিত্বে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এ-শোকসভার শুরুতে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।

শোকসভায় স্মৃতিচারণ করেন শওকত ওসমান, ফয়েজ আহমদ, রফিক আজাদ, আহমদ ছফা, সমুদ্র গুপ্ত, আনু মুহাম্মদ, অসীম সাহা, মোহাম্মদ রফিক, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, কবির দীর্ঘ সতের বছরের বন্ধু কামাল চৌধুরী, মঈনুল আহসান সাবের প্রমুখ। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র অকালপ্রয়াণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে শামসুর রাহমান বলেন, বুদ্ধদেব বসু তাঁর একটি লেখায় বলেছেন, মাঝে মাঝে সাহিত্য ভোগ নিয়ে থাকে। তাঁর এই উক্তির উপলক্ষ ছিলো অকালপ্রয়াত, উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতিশীল, অধুনা-বিস্মৃত কবি সুকুমার সরকার। বাংলাদেশের কাব্যসাহিত্য প্রায় পনেরো বছর আগে ভোগ নিয়েছিল প্রতিভাবান তরুণ কবি আবুল হাসানকে। তাঁর নামের সঙ্গে এ-বছর যুক্ত হল আরেকটি নাম, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। আহমদ ছফা শুধু বললেন, আহ আফশোস!

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে স্মরণ করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট একদিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আগামী ৭ জুলাই অনুষ্ঠেয় জোটের কর্মকা-ের মধ্যে রয়েছে কাওসার চৌধুরী সংগৃহীত কবির জীবনের নানা দিক নিয়ে একটি ডক্যুমেন্টারি প্রদর্শন, আবৃত্তি, গণসঙ্গীত পরিবেশনসহ আলোচনাসভা। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র নিজগ্রাম খুলনার মিঠেখালি থেকে কবির প্রতিষ্ঠিত ‘অন্তর বাজাও’ সঙ্গীতদল কবির লেখা গান পরিবেশন করবে। এ-উপলক্ষে প্রকাশিত হচ্ছে কবির ছবিসম্বলিত একটি পোস্টার ও স্মরণিকা।

তাঁর সুহৃদদের হৃদপি- হতে এক ফোঁটা রক্তক্ষরণের মতো দুঃসহ অনুভবের যন্ত্রণা দিয়ে চলে গেছেন এই আপাদমস্তক কবি মানুষটি, যে-মানুষের অভাব বোধ হবে অনেকদিন। তাঁর আত্মার শান্তি হোক।৫০

রুদ্রের মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয় ২২ জুন তারিখে। মরদেহের শেষযাত্রার অন্যতম সঙ্গী ছিলেন ইসহাক খান। প্রেসক্লাবের শোকসভার পরিস্থিতি এবং রুদ্রের মিঠেখালি যাত্রার পূর্বপ্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন-

প্রকৃতির অমোঘ নিষ্ঠুর ছোবলে একটি নক্ষত্র খসে পড়লো। ভেঙে গেলো তারার মেলা। সত্তরের রাগী, দ্রোহী, সময়ের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো। এ-বেদনা কোথায় রাখি। এ-বেদনা ভোলার নয়। বন্ধুর লাশ নিয়ে চলেছি। তার বহুল আলোচিত মিঠেখালি গ্রামে। যেখান থেকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিলো, সেই উৎসমূলে তাকে ঘুম পাড়াতে চললাম। প্রাণবান উচ্ছল মানুষটি পরম শান্তিতে শিশুর মতো ঘুমিয়ে আছে। ফুলে ফুলে ঢেকে আছে তার নিথর লাশ। আর আমরা কালের সাক্ষী হয়ে সঙ্গী হয়ে চলেছি ভাটির দেশে, মহুয়ার বনে। যার হাতছানি প্রতিবাদী এই তরুণও উপেক্ষা করতে পারে নি কোনোদিন। আজ তারই কোলে চিরদিনের জন্য মাথা নোয়াতে আসছে, তারই সন্তান। সেদিন কি সুন্দরবনের সুন্দর গাছগুলো আনন্দে কলরব করে উঠেছিলো? না-কি অব্যক্ত বেদনায় হয়েছিলো নীল?

২২ জুন, বিকেলে প্রেসক্লাব চত্বরে শত চেনামুখের ভিড়। সবগুলো মুখই তীব্র যন্ত্রণায় বিমর্ষ, বিধ্বস্ত। আর মাত্র একটু পরেই বন্ধুর শবযাত্রা শুরু হবে। মহাখালী হিমাগার থেকে সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লার শেষযাত্রা শুরু হবে। আমার ভেতরে ভেতরে শুধু সেই ভাবনা। তবু প্রেসক্লাবে একটু আসতে ইচ্ছে হলো। রুদ্রের শোকসভায় খানিকটা উপস্থিতি দিয়ে যাই। যখন জেগে ছিলো তখনও তো সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলাম, ঘুমিয়ে থাকার মুহূর্তে সংগে থাকব না, তা কি হয়? তাহলে যে আমার অন্তর-আত্মা আজীবন হাহাকার করবে। বিকেল সাড়ে চারটা। প্রেসক্লাব মিলনায়তনে শোকাহত মানুষের ভীড়। করুণ ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে আছে সবাই। দেশের বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকরা এসেছেন তরুণ সম্ভাবনাময় অকালপ্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর স্মরণে শোক জানাতে। আমি যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই শোকবার্তাগুলো কুড়িয়ে পকেটস্থ করছি, বন্ধুর জন্য নিয়ে যেতে। যেন সময়মতো কানে কানে বলে দেব, তুই আছিস, তুই থাকবি, তোর মৃত্যু নেই।

ঘড়ির কাটা পাঁচের ঘরে। শোকসভা তখনও শুরু হয় নি। আমাদের যাত্রা শুরু হবে আর একটু পর। বেরিয়ে পড়ব-পড়ব ভাবছি। তরুণ কবি ইস্তেকবাল হোসেন কাছে এসে বললো, ‘এখনই চলে যাবেন? আপনি রুদ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আপনি কিছু বলে যাবেন না?’ আমি জবাবে অপারগতা প্রকাশ করলাম। বললাম, ‘এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না। নিজেকে ধরে রাখতে পারব না তাহলে।’ পাশ দিয়ে তরুণ কবি, বন্ধু তুষার দাশ যেতে যেতে বললো, ‘কী দেখছি ভাই, যারা একসময় রুদ্রের বিরোধিতা করেছে, আজ মঞ্চে তারাই বেশি ছুটোছুটি করছে।’

বললাম, ‘করুক। যার যে কাজ সে তাই করবে। আমরা আমাদের মতো করব।’

‘হ্যাঁ তাই।’ তুষার সমর্থন জানালো।৫১

এরপর ইসহাক খান শোকসভা থেকে মহাখালি চলে যান। কিছুক্ষণ পরে সেখানে পৌঁছেন কবি আখতার হুসেন, কবি কামাল চৌধুরী প্রমুখ। সে-সময়ের বর্ণনা পাওয়া যায় কবি কামাল চৌধুরীর একটি তাৎক্ষণিক রচনায়-

পত্রিকার সংবাদ পড়ে ভেবেছিলাম রুদ্রের মরদেহ মিঠেখালিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রেসক্লাবের শোকসভায় এসে ইসহাক-এর কাছে জানতে পারলাম লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নি। মহাখালীর কলেরা হাসপাতালের ডিপ ফ্রিজে রেখে দেয়া হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ সেখান থেকে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে নিয়ে যাবে। রুদ্রকে শেষবার দেখার জন্য অসমাপ্ত শোকসভা থেকে কবি আখতার হুসেন, মইনুস সুলতানসহ চলে গেলাম মহাখালীতে। সেখানে তখনও তার আত্মীয়-স্বজন পৌঁছে নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তারকে অনুরোধ করলাম একবার দেখার সুযোগ করে দিতে। তিনি রাজী হলেন না। সাড়ে সাতটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম রুদ্রের আত্মীয়-স্বজনের জন্য। তারা কেউ তখনও আসে নি। আবার অনুরোধ করলাম কয়েকজনকে। এবার সুযোগ মিললো। ডিপ ফ্রিজে মাত্র একটি লাশ। দ্বিধায় পড়ে গেলাম। ফ্রিজের পাশে আলমারির উপরে জাতীয় কবিতা পরিষদ-এর পুষ্পস্তবক দেখে নিশ্চিত হলাম। পলিথিন সরিয়ে উন্মুক্ত করা হলো রুদ্রের মুখাবয়ব। সেই পরিচিত মুখ, জীবনের অনেকটা সময় যে ছিলো আমার নিত্যসঙ্গী, মৃত্যুতে একটুও মলিন হয় নি তার ঔজ্জ্বল্য। মনে হলো নৈঃসঙ্গ, বিরহ আর বিচ্ছেদের গভীর ক্ষত অতিক্রম করে এক প্রশান্তির ঘুমে সে শায়িত। আখতার ভাই বললেন, কামাল, আপনি তাকে স্পর্শ করুন। আপনার বন্ধু, স্পর্শ দিয়ে শেষ বিদায় জানান। আমি তার কপাল স্পর্শ করলাম, শীতল কপাল হিম ঘরে শুয়ে আছে প্রাণবন্ত উষ্ণ রুদ্র। তবু মনে হলো আমি তার হৃদয়ের উষ্ণতাকে স্পর্শ করেছি। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। তার সাথে আমার আর কথা হবে না। ‘তখন সন্ধ্যের পর আমাদের সব কথা বলা হয়ে গেছেÑ আমাদের সব গল্প, সব কথা, সব স্মৃতি বলা হয়ে গেছে’।৫২

এরপর রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ অন্তিমশয়ানে চলে যান তাঁর চিরচেনা, শৈশবের স্মৃতিধন্য মোংলার মিঠেখালিতে। সেখানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।


তথ্যনির্দেশ




১. আবদুল মান্নান সৈয়দ, সত্তরের কয়েকজন কবি, করতলে মহাদেশ, শিল্পতরু, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ২০৯।
২. রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর বড় বোন বীথিকা শারমিন ও সেজো বোন মেরী শারমিন, ১৩/১২/১৯৯৭ তারিখে অনুষ্ঠিত লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে।।
৩. কাজল চক্রবর্তী (সম্পাদনা), প্রামাণ্য রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, সাংস্কৃতিক খবর, কলকাতা ১৯৯২, পৃষ্ঠা ৬।
৪. ডা. মোঃ সাইফুল্লাহ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর মেজো ভাই, লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতা।
৫. জাফর ওয়াজেদ, লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতা।
৬. রেজা সেলিম, লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতা।
৭. রেজা সেলিম, প্রেমে-অপ্রেমে, শিল্প-সাহসে পুড়েছে রুদ্রের যে হৃদয়, সাপ্তাহিক পূর্বাভাস, ঢাকা, ১ জুলাই ১৯৯১।
৮. বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশের লেখক-পরিচিত, ঢাকা, ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ১৬৩।
৯. আলমগীর রেজা চৌধুরী, অচল পত্র, কিছুধ্বনি, ঢাকা, অক্টোবর ১৯৯১ (২৭ বর্ষ ১ম সংখ্যা)।
১০. পিতাকে লেখা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর পত্র, ১৬/৬/১৯৮৩, মুহম্মদপুর।
১১. তসলিমা নাসরিন, রুদ্র ফিরে আসুক, আজকের কাগজ, ৪ জুলাই ১৯৯১।
১২. রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, চিঠি, সাপ্তাহিক পূর্বাভাস, নভেম্বর ১৯৯০।
১৩. শিহাব মাহমুদ, বিচ্ছেদপ্রাপ্ত এক পুরুষের কথা, সাপ্তাহিক পূর্ণিমা, ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৯০।
১৪. তসলিমা নাসরিন, প্রাগুক্ত।
১৫. তসলিমা নাসরিন, প্রাগুক্ত।
১৬. জাফর ওয়াজেদ, লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎকার।
১৭. আলমগীর রেজা চৌধুরী, প্রাগুক্ত।
১৮. মুহম্মদ নূরুল হুদা, রুদ্র-র শুভদৃষ্টি, সার্ত ও অন্যান্য, মুক্তধারা, ১৯৯৩।
১৯. কামাল চৌধুরী, রুদ্র : অমলিন স্মৃতি, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ৫ জুলাই ১৯৯১।
২০. রেজা সেলিম, প্রাগুক্ত।
২১. কামাল চৌধুরী, প্রাগুক্ত।
২২. হাসান ফেরদৌস, বই-পরিচিতি, সাপ্তাহিক সন্ধানী, ২৪ মে ১৯৮১।
২৩. সুবিনয় রেজা, গ্রন্থ-আলোচনা, সিম্ফনী, জুন ১৯৮১।
২৪. নূর উল করিম খসরু, লেখালেখি, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮১।
২৫. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মৌলিক মুখোশে এসে সংহত হয়েছে, কবিতার দশদিক, সেপ্টেম্বর ১৯৯১।
২৬. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, রুদ্র এবং তার এলোমেলো চন্দ্রিমার চিত্র, ঢাকার চিঠি, ১-১৫ জুলাই ১৯৯১।
২৭. নাসির আহমেদ, চেতনার খুব কাছাকাছি, কিছুধ্বনি, অক্টোবর ১৯৯১।
২৮. শান্তনু কায়সার, রুদ্র ও মিলনের স্মৃতি, আজকের কাগজ, প্রাগুক্ত।
২৯. শামসুর রাহমান, ফিরে পাব কি তাঁর স্বর্ণগ্রাম, সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, ৪ জুলাই ১৯৯১।
৩০. নির্মলেন্দু গুণ, পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্মরণসভার বক্তৃতা (৭ জুলাই ১৯৯১), রবিন দাসের প্রতিবেদন, সাপ্তাহিক চিত্রবাংলা, ১৯-২৫ জুলাই ১৯৯১।
৩১. মহাদেব সাহা, রুদ্র কোমল, কবিতার দশদিক, সেপ্টেম্বর ১৯৯১।
৩২. অসীম সাহা, পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্মরণসভার বক্তৃতা, প্রাগুক্ত।
৩৩. জাফর ওয়াজেদ, লেখককে দেয়া লিখিত সাক্ষাৎকার।
৩৪. রেজা সেলিম, প্রাগুক্ত।
৩৫. কামাল চৌধুরী, প্রাগুক্ত।
৩৬. আলমগীর রেজা চৌধুরী, প্রাগুক্ত।
৩৭. ইসহাক খান, মৃত্যুহীন প্রাণ, রোববার, ৩০ জুলাই ১৯৯১।
৩৮. রবিউল হুসাইন, রুদ্রের কবিতা-জীবন, কিছুধ্বনি, অক্টোবর ১৯৯১।
৩৯. ঞঁংযধৎ উধং, ওহ গবসড়ৎরধস, ঞযব উযধশধ ঈড়ঁৎরবৎ, ঔঁষু ১২-১৮, ১৯৯১.
৪০. ফেরদৌস নাহার, লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎকার।
৪১. তসলিমা নাসরিন, প্রাগুক্ত।
৪২. রশীদ হায়দার, কয়েকদিনের কয়েক ঘণ্টা, কিছুধ্বনি, অক্টোবর ১৯৯১।
৪৩. ইসহাক খান, দ্রোহ যাকে করেছে রুদ্র, সাপ্তাহিক সংবাদচিত্র, ৫ জুলাই ১৯৯১।
৪৪. আনিসুল হক, রুদ্র-স্মৃতি, সাপ্তাহিক পূর্বাভাস, ১ জুলাই ১৯৯১।
৪৫. তসলিমা নাসরিন, প্রাগুক্ত।
৪৬. রেজা সেলিম, প্রাগুক্ত।
৪৭. আবু মাসুম, রুদ্র আপনি বলেছিলেন কবিতা দেবেন, মাসিক নান্দনিক, আগস্ট ১৯৯১।
৪৮. সমরেশ দেবনাথ, কবিতার দশদিক, সেপ্টেম্বর ১৯৯১।
৪৯. শাহাদাত চৌধুরী (সম্পাদনা), সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২৬ জুন ১৯৯১।
৫০. রিশিত খান, অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক জোস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই, সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, ৪ জুলাই ১৯৯১।
৫১. ইসহাক খান, মৃত্যুহীন প্রাণ, প্রাগুক্ত।
৫২. কামাল চৌধুরী, প্রাগুক্ত।

উৎস : রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (জীবনীগ্রন্থ), বাংলা একাডেমী, ঢাকা, জুন ১৯৯৮